আজ শুক্রবার, নভেম্বর ২৭, ২০২০ইং

অমর প্রেম কাহিনী : এডভোকেট সুয়েব আহমদ

লাইলি-মজনু: মধ্যযুগের ইরানি কবি নিজামী চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন তার কাব্য লায়লি-মজনুর জন্য। আরব মিথ ‘লায়লা-মজনু’ অবলম্বনে তিনি তার কাব্য রচনা করেন। অধরা প্রেমের এক বিয়োগন্ত গাথা এ কাব্য। কাব্য লিখিত হওয়ার আগে শতাব্দী থেকে শতাব্দীতে এই মিথ আরবে প্রচলিত ছিল। পান্ডুলিপি এবং সিরামিকে মূর্ত চিত্রে জীবন্ত হয়ে ছিল এই মিথ। বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে লায়লা এবং কায়েস একে অপরের প্রেমে পড়েন। তাদের প্রেম সমাজের নজরে এলে দুজনের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ নিষিদ্ধ করা হয়। নিঃসঙ্গ কায়েস মরুপ্রান্তরে নির্বাসনে যান। বিরহকাতর কায়েসের ক্ষ্যাপাটে আচরণের জন্য তাকে ডাকা হতো মজনুন (পাগল) নামে। মরুভূমিতে এক বৃদ্ধ বেদুইন লড়াই করে লায়লাকে পাওয়ার জন্য কায়েসকে প্রেরণা দেন। লায়লার গোত্র ক্ষমতাচ্যুত হয়, কিন্তু তারপরও লায়লার বাবা কায়েসের সঙ্গে লায়লার বিয়েতে সম্মতি দেন না। অন্যত্র বিয়ে দেওয়া হয় লায়লার। লায়লার স্বামীর মৃত্যুর পর বৃদ্ধ বেদুইন লায়লা এবং মজনুর মধ্যে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন।

মৃত্যুর পর তাদের পাশাপাশি সমাধিস্থ করা হয়। স্বর্গে গিয়েও ভালবাসার মানুষকে চাওয়ার তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের আকুতি এই কাহিনীকে অমর করে রেখেছে।

পাওলো-ফ্রান্সেসকা: দান্তের অমর কীর্তি ‘ডিভাইন কমেডি’র দুই কিংবদন্তি চরিত্র পাওলো এবং ফ্রান্সেসকা। এটি একটি সত্য ঘটনাকে ঘিরে তৈরি কাব্য। ফ্রান্সেসকাকে বিয়ে দেওয়া হয় জিয়ানসিয়োতো নামক এক নিষ্ঠুর ব্যক্তির সঙ্গে। কিন্তু ফ্রান্সেসকা ভালবাসতো জিয়ানসিয়োতোর ভাই পাওলোকে। তাদের মধ্যে প্রেম শুরু হয় (দান্তের বর্ণনা মতে) ল্যান্সেলট এবং গুইনিভেরাকে নিয়ে লেখা একটি বই একসঙ্গে পড়ার মাধ্যমে। পাওলো এবং ফ্রান্সেসকার মধ্যকার প্রেম প্রকাশিত হয়ে পড়লে জিয়ানসিয়োতো তাদের দুজনকেই হত্যা করেন।

সেলিম-আনারকলি: মুঘল সম্রাট আকবরের পুত্র সেলিম প্রেমে পড়েন সাধারণ কিন্তু অনিন্দ্য সুন্দরী নর্তকী আনারকলির। আনারকলির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রথম দর্শনেই তার প্রেমে পড়েন সম্রাটপুত্র সেলিম। কিন্তু এ প্রেমে বাধা আসে সম্রাটের তরফ থেকে। সম্রাট আনারকলিকে সেলিমের চোখে খারাপ প্রমাণ করতে নানা ধরনের চক্রান্ত করেন। পিতার এ কৌশলের কথা জানামাত্র সেলিম সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। সেলিম পরাজিত হন এবং তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়। তখন প্রিয়তম সেলিমের জীবন বাঁচাতে আনারকলি নিজের প্রেমকে পরিত্যাগ করতে সম্মত হন। সেলিমের চোখের সামনে আনারকলিকে জ্যান্ত কবর দেওয়া হয়।

ক্লিওপেট্রা-মার্ক অ্যান্টনি: ক্লিওপেট্রা এবং মার্ক অ্যান্টনির প্রেমের সত্য কাহিনী পৃথিবীজুড়েই আলোচিত। এ দুই বিখ্যাত ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে নাটক লিখেছেন শেক্সপিয়র। নাটকটি এখনো পৃথিবীর সবখানেই সমাদৃত। অ্যান্টনি এবং ক্লিওপেট্রা প্রথম দর্শনেই পরস্পরের প্রেমে পড়েন। এ দুই ক্ষমতাধর মানুষের প্রেম মিসরকে পৃথিবীর অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত করে। কিন্তু এ প্রেম রোমান শাসকদের মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এ প্রেমই মিসরকে ক্ষমতাশালী করে তুলছিল। বিয়ে হয় অ্যান্টনি এবং ক্লিওপেট্রার। ধারণা করা হয়, রোমানদের সঙ্গে যুদ্ধরত অবস্থায় অ্যান্টনি প্রিয়তমা ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর ভুল খবর পান। ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর বেদনা সইতে না পেরে অ্যান্টনি নিজ তলোয়ার দিয়ে আত্মহত্যা করেন। অন্যদিকে অ্যান্টনির মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ক্লিওপেট্রাও আত্মহত্যা করেন।

রোমিও-জুলিয়েট: নিঃসন্দেহে রোমিও এবং জুলিয়েটের প্রেমের আখ্যান দুনিয়ার অন্যতম বিখ্যাত প্রেম কাহিনী। প্রেমের প্রতিশব্দই হয়ে গেছেন এ যুগল। রোমিও-জুলিয়েট উইলিয়াম শেক্সপিয়র রচিত একটি ট্র্যাজেডি। সারা দুনিয়ায় যুগে যুগে পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে এ বিয়োগান্ত প্রেম কাহিনী।

রোমিও আর জুলিয়েটের পরিবারের মধ্যে শত্রুতার সম্পর্ক ছিল। পারস্পর শত্রু দুই পরিবারের তরুণ সন্তানদ্বয় প্রথম দেখাতেই একে অপরের প্রেমে পড়েন। প্রেম গড়ায় বিয়েতে। প্রেমের জন্য দুজনই ঝুঁকির মধ্যে ফেলেন তাদের জীবন। দুই পরিবারের শত্রুতার জেরে প্রাণ দিতে হয় এই প্রেমিক যুগলকে। তরুণ এ যুগলের ভালবাসার জন্য মৃত্যুবরণ আজো পৃথিবীর মানুষকে একই আবেগে নাড়া দেয়।

অরফিয়াস-ইউরিডাইস: এটি প্রাচীন গ্রিসের এক অন্ধ প্রেমের কাহিনী। অরফিয়াস প্রেমে পড়েন সাগর, বন, পর্বতের অধিষ্ঠানকারিনী উপদেবী ইউরিডাইসের। বিয়ে হয় দুজনের। আনন্দেই কাটছিল দুজনের জীবন। ভূমি এবং কৃষির দেবতা পরিস্টিয়াসের নজর পড়ে ইউরিডাইসের ওপর। কিন্তু ইউরিডাইসের প্রেম না পেয়ে তার ক্ষতি করতে উদ্যত হন। পরিস্টিয়াসের হাত থেকে বাঁচার জন্য ইউরিডাইস পালাতে গিয়ে পড়েন এক সাপের গর্তে। সাপ তার পায়ে হানে বিষাক্ত ছোবল। শোকে কাতর অরফিয়াসের হৃদয় বিদীর্ণ করা হাহাকার শুনে পরী আর দেবতাদের চোখে জল আসে। দেবতাদের পরামর্শে অরফিয়াস পাতালে প্রবেশ করেন। সেখানে তার গান শুনে হেডস-এর মন গলে। হেডস ইউরিডাইসকে অরফিয়াসদের সঙ্গে পৃথিবীতে পাঠাতে রাজি হন। কিন্তু সেজন্য দেন এক বিশেষ শর্ত। অরফিয়াসকে ইউরিডাইসের সামনে থেকে হেঁটে যেতে হবে এবং যতক্ষণ তারা পৃথিবীতে না পৌঁছবে ততক্ষণ অরফিয়াস পেছনে তাকাতে পারবে না। কিন্তু উৎকণ্ঠিত অরফিয়াস হঠাৎই ইউরিডাইসকে দেখতে পেছনে ফেরেন। আর তখনই অরফিয়াসের জীবন থেকে চিরদিনের মতো অদৃশ্য হয়ে যান প্রিয়তমা ইউরিডাইস।

প্যারিস-হেলেন: ট্রয়ের যুদ্ধ হোমারের ইলিয়ডে বর্ণিত একটি বিখ্যাত গ্রিক মিথ। বিশ্বসাহিত্যে হেলেন সেরা সুন্দরীর আসনে অধিষ্ঠিত। স্পার্টার রাজা মেনিলাসের সঙ্গে হেলেনের বিয়ে হয়। ট্রয়ের রাজা প্রিয়ামের সন্তান ছিলেন প্যারিস। এ প্যারিস পাগল হন হেলেনের প্রেমে। প্রেমে অন্ধ হয়ে হেলেনকে অপহরণ করে নিয়ে আসেন ট্রয়ে। হেলেনকে উদ্ধারে মেনিলাসের ভাই অ্যাগামেমননের নেতৃত্বে বিরাট গ্রিক সেনাদল ট্রয়ের অভিমুখে যাত্রা করে। যুদ্ধে ধ্বংস হয় ট্রয় নগরী। হেলেন অক্ষত অবস্থায় স্পাকর্টায় ফিরে আসেন। বাকি জীবন তিনি মেনিলাসের সঙ্গে আনন্দেই কাটিয়ে দেন।

রানী ভিক্টোরিয়া-প্রিন্স অ্যালবার্ট: ব্রিটিশ রাজ পরিবারের সত্য এক প্রেমের কাহিনী এটি। রানী ভিক্টোরিয়ার প্রেম স্বামীর মৃত্যুর ৪০ বছর পরও জীবন্ত ছিল বিরহ কাতরতায়। ভিক্টোরিয়া কৈশোরে ছিলেন উচ্ছল আর হাসিখুশি স্বভাবের।

তিনি স্কেচ এবং ছবি আঁকতে ভালবাসতেন। ১৮৩৭ সালে চাচা রাজা চতুর্থ উইলিয়ামের মৃত্যুর পর তিনি ইংল্যান্ডের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিন বছর পর ভিক্টোরিয়া তার কাজিন প্রিন্স অ্যালবার্টকে বিয়ে করেন। প্রিন্স অ্যালবার্ট জার্মান জাতিসত্তার মানুষ হলেও রাজপরিবারের প্রতি আনুগত্য এবং বিচক্ষণতার জন্য প্রশংসিত হন। নয়টি সন্তান জন্ম নেয় এই দম্পতির। ভিক্টোরিয়ার ভালবাসা স্বামীকে ঘিরে ক্রমেই বাড়তে থাকে। রাষ্ট্র পরিচালনা এবং কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে তিনি অ্যালবার্টের ওপর নির্ভর করতেন। ১৮৬১ সালে ভিক্টোরিয়াকে অকূল সাগরে ভাসিয়ে অ্যালবার্ট দুনিয়া ছাড়েন। শোকে মুহ্যমান রানী পরের তিনটি বছর একবারের জন্যও লোকসমক্ষে আসেননি। তার এই বিরহ শোক জনতার সমালোচনার মুখে পড়ে। জীবননাশের হামলাও হয় ভিক্টোরিয়ার ওপর। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন ডিসরেলি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ১৮৬৬ সালে রানী পুনরায় কাজ শুরু করেন এবং পার্লামেন্টে যোগ দেন। কিন্তু স্বামীর জন্য শোক তার মনকে ১৯০১ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভিক্টোরিয়া শোকের কালো পোশাক পরিধান করতেন। তার শাসনামলেই ব্রিটেন সুপার পাওয়ার হিসাবে দুনিয়াতে আবির্ভূত হয়।

ত্রিস্তান-ইসলদে: ত্রিস্তান আর ইসলদের ট্র্যাজিক প্রেমগাথা যুগ যুগ ধরে নানা কাহিনী আর পান্ডুলিপিতে লিপিবদ্ধ হয়েছে। মধ্যযুগে রাজা আর্থারের রাজত্বকালের ঘটনা এটি। ইসলদে ছিলেন আয়ারল্যান্ডের রাজকন্যা। ছিলেন কর্নওয়েলের রাজা মার্কের বাগদত্তা। মার্ক তার ভাইপো ত্রিস্তানকে পাঠান ইসলদেকে কর্নওয়েলে নিয়ে আসার জন্য। যাত্রাপথে ত্রিস্তান আর ইসলদে পরস্পরের প্রেমে পড়েন। বাধ্য হয়েই ইসলদে বিয়ে করেন মার্ককে, কিন্তু ভালবাসা অব্যাহত থাকে ত্রিস্তানের সঙ্গে। এক সময় এই প্রেম রাজা মার্কের নজরে আসে। তিনি ইসলদেকে ক্ষমা করে দেন, কিন্তু ত্রিস্তানকে কর্নওয়েলে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ত্রিস্তান চলে যান ব্রিটানিতে। সেখানে তার সঙ্গে পরিচয় হয় আইসিলতের সঙ্গে। ইসলদের সঙ্গে এই তরুণীর নামের সাদৃশ্য ত্রিস্তানকে আইসিলতের প্রতি আকৃষ্ট করে। দুজনের বিয়ে হয়। এই বিয়ে কখনোই পূর্ণতা পায়নি, কারণ ত্রিস্তানের হৃদয় ছিল ইসলদের প্রেমে আচ্ছন্ন। এক সময় মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন ত্রিস্তান। খবর পাঠান ইসলদের কাছে, যেন একবার ত্রিস্তানকে দেখে যান। ইসলদে যদি রাজি থাকেন তাহলে জাহাজের পালের রঙ হবে সাদা আর না আসতে চাইলে কালো। আইসিলত দেখতে পান জাহাজের পালের রঙ সাদা কিন্তু তিনি ক্রিস্তানকে মিথ্যা বলেন। তাকে জানান পালের রঙ কালো। শোকে ইসলদে তার কাছে পৌঁছানোর আগেই ত্রিস্তান মারা যান। ভগ্ন হৃদয় নিয়ে ইসলদেও কিছুদিন পর মারা যান।

নেপোলিয়ান ও জোসেফাইন: ২৬ বছর বয়সী নেপোলিয়ান তার চেয়ে বড়, বিখ্যাত এবং বিত্তশালী জোসেফাইনের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা পরস্পরের প্রতি গভীর ভালবাসায় নিমগ্ন হন। তাদের স্বভাব, আচার-আচরণে অনেক পার্থক্য ছিল, কিন্তু এগুলো তাদের প্রেমবন্ধনকে আরো দৃঢ় করেছে, ফলে তাদের ভালবাসা কখনো ম্লান হয়ে যায়নি। কিন্তু পরিশেষে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে কারণ, জোসেফাইন নেপোলিয়ানের উত্তরাধিকার অর্জনের উচ্চাকাক্সক্ষা পূরণে ব্যর্থ হন। তাই পরস্পরের প্রতি গভীর আসক্তি এবং ভালবাসা থাকা সত্ত্বেও তারা একত্রে জীবনযাপন করতে পারেননি।

অ্যাবেলার্ড ও হিলোয়েজ: অ্যাবেলার্ড ও হিলোয়েজের কাহিনী পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিখ্যাত ১০টি প্রেম কাহিনীর একটি। এটি এক যাজক এবং সন্ন্যাসিনীর ভালবাসার গল্প, যা পৃথিবীব্যাপী জনপ্রিয়। ১১০০ সালের দিকে, অ্যাবেলার্ড প্যারিসের নটর ডেমে লেখাপড়া করতে যান। সেখানে তিনি একজন ব্যতিক্রমী দার্শনিকের উপাধি লাভ করেন। এ কারণে নটর ডেমের প্রধান প-িত, ফুলবার্ট, তার ভাতিজি হিলোয়েজকে শিক্ষা দান করার জন্য অ্যাবেলার্ডকে নিযুক্ত করেন। অ্যাবেলার্ড এবং বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হিলোয়েজ পরস্পরের প্রতি গভীর ভালবাসায় আসক্ত হন। এ সময় তাদের একটি সন্তান জন্ম নেয়। ফলে তারা বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন। কিন্তু এ ঘটনায় ফুলবার্ট ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। তাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অ্যাবেলার্ড, হিলোয়েজকে রক্ষার খাতিরে তাকে কিছুদিনের জন্য একটি সন্ন্যাস মঠে প্রেরণ করেন। কিন্তু অ্যাবেলার্ডের এ আচরণে ফুলবার্ট ভেবে নেন, অ্যাবেলার্ড তার ভাতিজিকে চিরদিনের জন্য ত্যাগ করেছে। তাই প্রতিশোধপরায়ণ ফুলবার্ট তার প্রেরিত ভৃত্য কর্তৃক ঘুমন্ত অবস্থায় অ্যাবেলার্ডকে পুরুষত্বহীন করেন। এ ঘটনার পর অ্যাবেলার্ড একজন যাজকে পরিণত হন এবং জ্ঞান ও শিক্ষার ক্ষেত্রে তার জীবন উৎসর্গ করেন। সান্ত্বনাতীত হিলোয়েজও সন্ন্যাসব্রত নির্বাচন করেন। তবে বিচ্ছেদ এবং বিভিন্ন সমস্যা সন্ত্বেও তারা পরস্পরকে ভালবাসতেন। পরবর্তী সময়ে তাদের আবেগপূর্ণ প্রেমপত্রগুলো পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।

ল্যান্সলট ও গুনিভেয়ার: স্যার ল্যান্সলট এবং রানী গুনিভেয়ারের হৃদয় বিদারক প্রেমকাহিনী বিখ্যাত আর্থারিয়ান মিথগুলোর মধ্যে অন্যতম। ল্যান্সলট, রাজা আর্থারের পত্মী রানী গুনিভেয়ারের প্রেমে পড়ে যান। প্রথমদিকে গুনিভেয়ার ল্যান্সলটকে এড়িয়ে চলেছিলেন, কিন্তু ক্রমেই গুনিভেয়ার ল্যান্সলটের প্রতি আসক্ত হন এবং তারা প্রেম-যুগলে পরিণত হন। এক রাতে, রাজা আর্থারের ভাতিজা স্যার আগ্রাভিয়ান এবং স্যার মোড্রেড ১২ জন নাইটকে রানী গুনিভেয়ারের সভাকক্ষে প্রেরণ করে। তারা এই যুগল-বন্দিকে আক্রমণ করেন। এ সময় ল্যান্সলট ত্বরিত পলায়নে সক্ষম হন কিন্তু গুনিভেয়ারের ভাগ্য এতটা সুপ্রসন্ন ছিল না। তাকে অবিশ্বস্ততার অপরাধে অভিযুক্ত করা হয় এবং আগুনে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিছুদিন পর ল্যান্সলট তার ভালবাসার মানুষকে আগুন থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে নির্ভীকভাবে ফিরে আসেন। এ দুঃখজনক ঘটনার কারণে রাজ্যের নাইটবৃন্দের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয় এবং রাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ল্যান্সলট তার জীবনের শেষ দিনগুলো নিভৃতে নিঃসঙ্গভাবে কাটিয়েছিলেন। অন্যদিকে, গুনিভেয়ার অ্যামসবারিতে একজন যাজিকা হিসাবে নিজের জীবন শুরু করেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।

স্কারলেট ও’হারা ও রেট বাটলার: সাহিত্য জগতে মার্গারেট মিচেলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’ একটি অমর সৃষ্টি। তিনি এখানে স্কারলেট ও’হারা এবং রেট বাটলারের ধারাবাহিক প্রেমের এবং ঘৃণার সম্পর্কের একটি নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন। এ উপন্যাসে স্কারলেট কিংবা বাটলার কেউই সময়ের সঠিক উপযোগিতা উপলব্ধি করতে পারেনি। এ কাহিনীতে দেখা যায়, উগ্র দ্বৈত অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে শুধু কামুকতা সৃষ্টি করেছে, কিন্তু কোনো স্থায়িত্ব সৃষ্টি করেনি। ছলনাময়ী, উচ্ছৃঙ্খল স্কারলেট তার অসংখ্য পাণিপ্রার্থীর মধ্য থেকে সঠিক জীবনসঙ্গী নির্বাচনে বিভ্রান্তিতে ভোগেন। অবশেষে বাটলারের সঙ্গেই স্থায়ী সম্পর্ক গড়তে সিদ্ধান্ত নেন। ততদিনে বাটলার স্কারলেটের চঞ্চল আচরণের কারণে অনেক দূরে সরে গেছেন। উপন্যাসের সমাপ্তিতে স্কারলেট আশাকে আঁকড়ে ধরে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করেন।

অডিসিয়াস ও পেনেলোপ: গ্রিসের এই প্রেমিক-প্রেমিকার বন্দির কাহিনী করুণ কিন্তু মিলনাত্মক। দীর্ঘ বিশ বছর পৃথক থাকার পর তারা আবার মিলিত হতে পেরেছিলেন। বিয়ের মাত্র অল্প কিছুদিনের মধ্যেই যুদ্ধের কারণে অডিসি আর পেনেলোপের বিচ্ছেদ ঘটে। ভয়ঙ্কর সেই যুদ্ধ থেকে অডিসির ফিরে আসার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ ছিল। তবুও পেনেলোপ তার ১০৮ জন পাণিপ্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান করে একাকী থাকাই শ্রেয় মনে করেছেন। অন্যদিকে, অডিসিও একইভাবে পেনেলোপকে ভালবেসেছেন। তিনি তার ভালবাসার খাতিরে এক মায়াবিনী ডাকিনীর প্রেম এবং অমর তারুণ্য প্রত্যাখ্যান করে নিজের স্ত্রী-ছেলের কাছে ফিরে আসেন।

লেখকঃ আইনজীবী, সমাজকর্মী, কলামিস্ট, রাজনীতিবীদ।