আজ বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২২, ২০২০ইং

কর্মযজ্ঞ শেষ হলে স্বপ্নের পদ্মা সেতু মেঘ আর নীলাকাশের সঙ্গে করবে মিতালী

। এডভোকেট সুয়েব আহমদ ।

‘পদ্মার ঢেউ রে
মোর শূন্য হৃদয়পদ্ম নিয়ে যা, যা রে…

ভাটিয়ালি ঢঙে বিচ্ছেদধর্মী এই গানটি লিখেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। উপমহাদেশের আরেক কিংবদন্তি শচীন দেববর্মণের কণ্ঠে প্রথম ধারণ করা হয় গানটি। দাদরা তালে আরোপিত সুর এখনও ছুঁয়ে যায় অজস্র মানুষের মন। এটি শুধু তিন মিনিটের গানই নয়; এ যেন নদীর মাঝির শাশ্বত সংগীত।

এই পদ্মার বুকেই নৌকা ভাসিয়েছিলেন আরেক কবি। লিখেছিলেন শত-শত গান। তিনি আর কেউ নন; স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘সোনার তরী’তে লিখে গেছেন-

“ভরা পালে চলে যায়,
কোনো দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলো নিরুপায়
ভাঙে দু’ধারে।”

প্রমত্ত এই পদ্মার বুকে বাঙালির আরেক স্বপ্নের নাম ‘পদ্মা সেতু’। এ সেতু বাংলাদেশের মানুষের বহুদিনের আকাঙ্ক্ষার বিষয়। দেশের সর্বস্তরের মানুষের একটাই দাবি ছিল, পদ্মা সেতু।আর স্বপ্নের এই পদ্মা সেতু নির্মানের প্রারম্ভে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র শুরু হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল প্রকার ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করে কোন প্রকার বিদেশী ঋন বা সাহায্য ছাড়া বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করেন এবং বর্তমানে যার ফলে আমাদের দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার মান হবে আরো উন্নত। যা এ দেশের অর্থনীতিতেও রাখবে বিশেষ ভূমিকা। শিল্প-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

পদ্মাসেতু ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার লম্বা, যা বাংলাদেশের ভিতরে সবচেয়ে বড় সেতু হিসেবে স্থান দখল করে নেবে। সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের।

জাইকার সমীক্ষামতে, পদ্মা সেতুর মাধ্যমে প্রতিদিন ২১ হাজার ৩০০ যানবাহন যাতায়াতে সক্ষম হবে। আর ২০২৫ সালে এর পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ৪১ হাজার ৬০০-তে। এ সেতুর অবস্থান মাওয়া-জাজিরা পয়েন্ট (মুন্সীগঞ্জ-শরীয়তপুর)।

যদিও স্বপ্নের এই সেতু যেদিন পুরোটা মাথা তুলে দাঁড়াবে; পারাপারের নৌকা, স্পিডবোট, লঞ্চ, ফেরির বাণিজ্য সেদিন থেকে চুকেবুকে যাবে। হয়তো সেদিন পদ্মার বুকে শোভা বাড়াবে স্বপ্নের এই সেতু। নদীর এপার থেকে চোখ মেলে তাকালে সেদিনও মুগ্ধ করবে প্রকৃতির অপরূপ রূপ। বর্ষায় থই থই পদ্মার জল, আঁকাবাঁকা নদীর গতিধারা করবে আকর্ষণ।

শরতের উজ্জ্বল আকাশ, নীলিমা, নদীতীরে ফোঁটা কাশফুল কিংবা গান গেয়ে তরী বেয়ে চলে যাওয়া কোনো জেলেনৌকা, রূপোলি ইলিশ, পদ্মার ঢেউয়ে ঝিলমিল করা চাঁদের আলো সেদিনও একইরকমভাবে মন কাড়বে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের। আলোকচিত্রীর চোখ সেদিনও ঠিক একইভাবে আটকে যাবে ফ্রেমের পর ফ্রেমে।

তবে সেতুর ওপর দিয়ে সাঁই সাঁই করে ছুটে যেতে যেতে হাহাকারের সুর আওড়াবে কোনো কবিমন। উচ্চারণ করবে, ‘মহাকালের চিরন্তন স্রোতে মানুষ অনিবার্য বিষয়কে এড়াতে পারে না, কেবল টিকে থাকে তার সৃষ্ট সোনার ফসল, তার কর্ম।’

কর্মযজ্ঞ শেষ হলে স্বপ্নের পদ্মা সেতু মেঘ আর নীলাকাশের সঙ্গে করবে মিতালী এই আশায় বুক বেধে রইলাম।

লেখকঃ আইনজীবী, সমাজকর্মী, কলামিস্ট, রাজনীতিবীদ।