আজ বুধবার, অক্টোবর ২১, ২০২০ইং

বেপরোয়া টিলাগড় ছাত্রলীগ, দায় নিচ্ছে না কেউ!

ডেস্ক রিপোর্ট: দীর্ঘদিন থেকে সিলেট এমসি কলেজের হোস্টেল দখল করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০১২ সালে সেই এমসি কলেজের শতবর্ষী হোস্টেল পোড়ানো দিয়ে শুরু। তারপর থেকে অসংখ্য খুন, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, জবরদখল কিংবা সাম্প্রতিক ‘পাঠাকান্ড’ তো আছেই। বলা যায়, বেপরোয়া কার্যক্রমে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সিলেটের ‘টিলাগড় ছাত্রলীগ’।

আর গত শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯ টার দিকে সিলেট এমসি কলেজের হোস্টেলে এক তরুণীকে গণধর্ষণ করে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ফের জানান দিলেন- তারা কতোটা বেপরোয়া।

তবে তাদের আলোচিত কয়েকটি ঘটনার একটি ‘পাঠাকান্ড’! এর আগে চলতি বছরের ১১ মে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, সিলেট কার্যালয়ে প্রজননের জন্য সংগ্রহ করা ‘পাঠা’ থেকে একটি পাঠা ফ্রি-তে নিতে চান ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। এসময় প্রাণিসম্পদ অফিসের কর্মকর্তা প্রজননের জন্য নিয়ে আসা এসব পাঠা দিতে অস্বীকার করলে হামলার ঘটনা ঘটে। পরে এ নিয়ে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর নামে মামলাও হয়। অভিযুক্ত এসব কর্মীরা সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক রণজিৎ সরকারের অনুসারী।

এর বাইরেও খুন, চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে বছরের বেশিরভাগ সময় আলোচনায় থাকে সিলেটের টিলাগড়। টিলাগড়ে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী সিলেট এমসি কলেজ, সিলেট সরকারি কলেজ, সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়ে গড়ে উঠা দুই গ্রুপের কাছে জিম্মি সবাই। সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক রণজিৎ সরকার ও সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক আজাদুর রহমান আজাদের নেতৃত্বে পরিচালিত এ দুই গ্রুপের কারণে বারবার দেশব্যপি আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে সিলেট।

অথচ ছাত্ররাজনীতিতে তাদের দু’জন ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেও এখন আধিপত্যের লড়াইয়ে একে অন্যের ঘোর প্রতিপক্ষ। সময়ের ব্যবধানে আজাদ গ্রুপ ও রনজিৎ গ্রুপের রয়েছে একাধিক উপগ্রুপও। এসব গ্রুপের নেতাকর্মীর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে টিলাগড়ে খুন হয়েছেন কয়েকজন নেতাকর্মী। এছাড়া আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই ঘটে সংঘর্ষের ঘটনা। এর বাইরে যৌন হয়রানি, চাঁদাবাজি, ফাও খাওয়া, ছিনতাই থেকে শুরু করে সাংবাদিক নির্যাতনের মতো ঘটনাও ঘটেছে। তবে বেশির ভাগ ঘটনায় কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ।

জানা যায়, ২০০৩ সালের ৭ জানুয়ারি খুন হন আকবর সুলতান নামের এক ছাত্রলীগ কর্মী। একই বছরের ৯ অক্টোবর খুন হন মিজান কামালী আর ২০১০ সালের ১২ জুলাই অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে নগরীর টিলাগড়ে খুন হন এমসি কলেজের গণিত বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী উদয়েন্দু সিংহ পলাশ। এছাড়া ২০১৮ সালের ৭ জানুয়ারি টিলাগড় পয়েন্টে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের ছুরিকাঘাতে খুন হন সিলেট সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা তানিম আহমদ খান আর ২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবর সিলেট নগরের টিলাগড়ে ছাত্রলীগ কর্মী ওমর আহমদ মিয়াদ (২২) কে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

এর আগে ২০১৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নগরীর শিবগঞ্জে খুন হন ছাত্রলীগ কর্মী জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম। আর ২০২০ সালের (৬ ফেব্রুয়ারি) পূজার টাকার ভাগ-ভাটোয়ারা নিয়ে ছাত্রলীগ কর্মী সৈকত রায় সমুদ্রের নেতৃত্বে একদল যুবকের হামলায় অভিষেক দে দ্বীপ নামের ছাত্রলীগ কর্মী নিহত হন।

এছাড়া জিন্দাবাজারের তরুণ ব্যবসায়ী করিম বক্স মামুনকে হত্যা করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পরে হত্যাকাণ্ডে জড়িত মূল হোতা বলে চিহ্নিত সিলেট জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সহ-সভাপতি সুলেমান হোসেন চৌধুরীকে ঘটনার পর পরই আজীবনের জন্য বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। সুলেমান হোসেনও ছিলেন আজাদ অনুসারী। এছাড়া ২০১২ সালের ৮ জুলাই রাতে শিবির তাড়ানোর নামে মুরারি চাঁদ (এমসি) কলেজের ছাত্রাবাসের ৩টি ব্লকের ৪২টি কক্ষ পুড়িয়ে দেয় ছাত্রলীগ। যার কোনটিতে শাস্তির আওতায় আসেনি কেউ।

তবে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সভাপতি সিলেটের ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘কলেজে একজন নারীকে যেভাবে গণধর্ষক করেছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা, আমরা এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছি। সিলেটের এমসি কলেজে গত এক দশক ধরে ঘটনার পর ঘটনা চলছে। এখানে হোস্টেল পোড়ানো হয়েছে, ছাত্র হত্যা করা হয়েছে, এখানে ছাত্রীকে লাঞ্চিত করা হয়েছে। এর কোনোটারই বিচার হয়নি। কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে আমরা ভুগছি। এক সময় এমসি কলেজ ছিলো মেধাবীদের বাগান। এখন থেকে ছাত্ররা বের হয়ে দেশ পরিচালনা করছেন। আজকে সেখানে ধর্ষক, সন্ত্রাসী এবং খুনিদের আস্তানা হয়েছে। সরকারের কাছে আমরা বারবার বিচার চেয়েও বিচার পাইনি। যদি অতীতের ঘটনার বিচার হতো তাহলে আজকের এ ঘটনা ঘটতো না। তারপরও সরকারের কাছে দাবি জানাবো অবশ্যই যাতে এই ঘটনার বিচার করেন। কারণ আমরা দেখি প্রদীপের মতো লোককে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কারণে পুলিশের সর্বোচ্চ পদক দেয়া হয়, সেখানে এই যে ছেলেরা ঘটনার পর ঘটনা করে যাচ্ছে তাদের কি বিচার হবে। তারপরও আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করবো আপনি হস্তক্ষেপ করুন। আর আমরা সিলেটের মানুষ অভিভাকের অভাব অনুভব করছি। আমরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়ছি।’

করোনার সময় কিভাবে এসব ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হোস্টেলে ছিলো এমন প্রশ্ন করে তিনি কলেজের অধ্যক্ষ ও হোস্টেল সুপারকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

তিনি আরও বলেন, ‘কোনো কিছু ঘটলেই ছাত্রলীগ সবাইকে অনুপ্রবেশকারী বানিয়ে দেয়। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ ঘটনার পর ছাত্রলীগ কিংবা আওয়ামী লীগ যখন এসব কথা বলে তখন মানুষ হাসাহাসি করে।’

এদিকে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সিলেটের এমসি কলেজের এ ঘটনা লজ্জাজনক। অনেকেই আমার কাছে ঘটনার সম্পর্কে জানতে চেয়েছে, কিন্তু আমি কোনো উত্তর দিকে পারি নাই। এই যে ঘটনাগুলো ঘটেছে আমার মনে হয় ছাত্রলীগের নামধারী যেহেতু ছাত্রলীগের কমিটি নাই, সেজন্য ছাত্রলীগ বলবে কেন। আর যে এলাকায় ঘটনাগুলো ঘটেছে এইখানে কিন্তু গডফাদাররা আছে। বিভিন্ন ব্যানারে থাকা গডফাদারদের নামও কিন্তু আসছে। এই গ্রুপের কর্মীরা করেছে বা ওই গ্রুপের কর্মীরা করেছে। যেই করে থাকুন যদি গডফাদারই করে থাকুন কিংবা আমার আওয়ামী লীগ যদি জড়িত থাকেন তাহলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘করোনার কারণে হোস্টেল খোলা থাকার কথা নয়, তবে যদি সীমিত আকারে খোলাও থাকে তাহলে হল সুপারের আওতার ভেতরে ঘটেছে কি-না বা বাইরে ঘটেছে কি-না সেটি তো আমরা পুরোপুরি জানি না। তবে আমরা পুলিশ প্রশাসনকে অনুরোধ করেছি, দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করে আমাদেরকে দ্বায়মুক্ত করেন।’

তবে কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ ও এডভোকেট রণজিৎ সরকারের সঙ্গে আলাপের চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ স্থাপন করা যায় নি।

এদিকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ আছে এবং এখানে আপনি দেখেন আমাদের এমসি কলেজে দীর্ঘ ৭ বছর থেকে ছাত্রলীগের কোনো কমিটি নেই। দীর্ঘদিন কমিটি না থাকার কারণে অনেক সুবিধাবাদী রয়েছে। আপনারা দেখেছেন অনেক সময় সুবিধা নিয়ে অনেকে অনেক কিছু করেছে। আপনারা দেখেছেন সাহেদ আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করে কি প্রতারণা করেছে। আমাদের কথা হচ্ছে অপরাধী যেই হোক, যারা নিকৃষ্ট ধর্ষণের ঘটনাটি যে ঘটিয়েছে এজন্য কিন্তু আমরা নিন্দা জানিয়েছি। একই সাথে আমরা ছাত্রলীগের প্রত্যেক নেতাকর্মীদের আমরা নির্দেশনা দিয়েছে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্তদের যেখানে পাওয়া যাবে তাদেরকে যেন আইনের হাতে তুলে দেয়া হয়।’

জয় বলেন- ‘সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রলীগের গণর্ধষণের ঘটনায় যারা অভিযুক্ত তাদের কিন্তু ছাত্রলীগের কোনো পদবী নেই এবং তারা কিন্তু অনেকেই সুবিধাবাদী। করোনার কারণে কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হলগুলোও বন্ধ। সেখানে তারা অপকর্ম করার জন্য হয়তো ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় ওৎ পেতে থাকে। কিন্তু আমরা ছাত্রলীগ কখনই অন্যায়ের প্রশ্রয় দেই না। আমরা বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সবসময় ধর্ষকদের শাস্তি চায়।’

ভোরেরসিলেট/বিএ