আজ বুধবার, অক্টোবর ২১, ২০২০ইং

সুশিক্ষার জন্য প্রয়োজন সুশিক্ষক

সুশিক্ষার জন্য প্রয়োজন সুশিক্ষক

শিক্ষা জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রধান নিয়ামক। শিক্ষা মানবিক গুণাবলীকে বিকশিত করে। মানব জীবনকে করে পরিশীলিত। সুন্দর সমাজ গঠনের সুপ্ত শক্তিকে করে জাগ্রত। গৌরবময় জীবন যাপনের জন্য শিক্ষা মানুষকে করে সচেষ্ট। জাগ্রত করে ব্যক্তির আত্মসম্মানবোধ। মুক্ত করে কুসংস্কার ও পঙ্কিলতার রাহুগ্রাস থেকে। শিক্ষার কাজ, গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনেক ও সুদূরপ্রসারী। এখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে শিক্ষাটা কি? শিক্ষা হল মানুষের আচরণের কাঙ্ক্ষিত অপেক্ষাকৃত স্থায়ী পরিবর্তন। অন্যভাবে বলা যায়, শিক্ষা হল ঐ প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ব্যক্তি বা সমষ্টির জ্ঞান, কর্ম-দক্ষতা, চরিত্র ও মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি হয়। মানব শিশুর মাঝে কিছু সুপ্ত প্রতিভা বা সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, এই মূল্যবোধ ও সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলার নাম শিক্ষা। আর জাগিয়ে তোলার পর সেই মানবিক মূল্যবোধ ও আচরণকে মানুষের কাজে লাগালে তাকেই বলা হবে সু-শিক্ষা। সু-শিক্ষার জন্যই সুশিক্ষক।

তাহলে শিক্ষক কে? শিক্ষক হলেন যে কোনো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র। উপর্যুক্ত গুণাবলী ছাড়াও একজন নিবেদিত প্রাণ, সমগ্র সত্ত্বা ও শ্রেণিকক্ষে পদাধিকার বলে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী যিনি তিনিই শিক্ষক। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। এটা নিছক একটা চাকরি নয়। এটা খন্ডকালীন বিনোদন নয়। এটা একটা মহান ব্রত। শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর, সমাজ ও সভ্যতার অভিভাবক ও স্থপতি। অন্ধকারে আলোর দিশারী। শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে দেয়ার মহতী চেতনা তাঁকে করে অনুপ্রাণিত। তাঁর চাওয়া পাওয়া সীমিত। তিনি জানেন তাঁর চলার পথ মসৃণ নয় এবং ভবিষ্যৎ বিড়ম্বনাময়। তবু তিনি হৃদয়ের টানে এ সুকঠিন জীবিকার পথ বেছে নেন। এজন্য তাঁকে জীবন ব্যাপী সংগ্রাম করতে হলেও আদর্শচ্যুত হন না। ন্যায়-নীতির প্রশ্নে আপোষহীন সর্বদা। পার্থিব মোহ, ক্ষমতার লোভ, শাসকের রক্তচোখ, সামাজিক অনাচার, রাজনৈতিক বেড়াজাল সব কিছুর উর্ধ্বে তাঁর শিক্ষকতাই মহান আদর্শ। তিনি শিক্ষার্থীর মনন, মেধা, আত্মশক্তির বিকাশ, পরিশীলন, উন্নয়ন ও প্রসার সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

একজন আদর্শ শিক্ষক সহজ-সরল,নিরহঙ্কার, কর্তব্যনিষ্ঠ নি:স্বার্থ, নির্ভীক, গতিশীল ও কু-সংস্কারমুক্ত স্বচ্ছ মনের অধিকারী পন্ডিত ব্যক্তি। নিজের অর্জিত জ্ঞান ভান্ডারকে তিনি সমৃদ্ধতর করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করেন। নতুনকে জানার, নতুনকে গ্রহণ করার মানসিকতা তাঁর তীব্রতর।

এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন-যিনি শিক্ষক হবেন তাঁকে ছাত্রও হতে হবে। একজন সু-শিক্ষক জীবনব্যাপী ছাত্র। শিক্ষক ছাত্রত্ব গ্রহণ করলে তারুণ্য ও যৌবন নষ্ট হতে পারে না। বরং তিনি ছাত্রদের সুবিধা-অসুবিধা ভালভাবে বুঝতে সক্ষম হবেন এবং তাদের মনের কাছাকাছি থাকবেন। তাঁর কর্তব্যনিষ্ঠা, নিরলস পরিশ্রম, কঠিন নিয়ম ও শৃঙ্খলাবোধ শিক্ষার্থীদের প্রেরণার উৎস। কর্তব্য-কর্ম সম্পাদনে তিনি কখনো কোনও শৈথিল্য প্রদর্শন করেন না বা নিজের ব্যর্থতার জন্য কোনও রূপ অজুহাত সৃষ্টি করেন না। তাঁর পার্থিব চাহিদা সীমিত কিন্তু আত্মার স্বপ্ন সীমাহীন।

একজন সুশিক্ষক দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। শ্রেষ্ঠ মানুষের অন্যতম। জাতি তাঁর কাছে ঋণী। সমাজ ও জাতি গঠনে দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নে, দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে, বিশ্বের দরবারে নিজ দেশের গৌরবময় অবস্থান তুলে ধরতে একজন সুশিক্ষকের অবদান কোনো রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদ বা কোনো সমাজনেতার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়।

শিক্ষকরা সভ্যতার, আধুনিকতার ধারক-বাহক ও প্রচারক। ইসলামের প্রচারক নবী রসূলগণ ছিলেন সুশিক্ষক। আমাদের নবী হযরত মোহাম্মদ (সা:) বলেন- আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। শিক্ষকরা তাদেরই উত্তরসূরী। যে জাতি শিক্ষকদের যত মর্যাদা প্রদান করবে, সে জাতি বিশ্বের দরবারে তত উন্নত ও শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করবে। শিক্ষক সম্পর্কে হাদিস শরীফে আছে- যিনি শেখেন এবং শিক্ষা দেন তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। একথা নি:সন্দেহে বলা যায় যে, শিক্ষক সমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। কারণ তাঁদের কাজটা প্রাচীনকাল থেকেই শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে আসছে।

একজন শিক্ষকের দায়িত্ব অনেক। শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীকে উদ্দীপ্ত করা। এ উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায়, ধৈর্যশীল, পরিশ্রমী, অনুসন্ধানী ও জ্ঞান পিপাসুরূপে গড়ে তোলাই হবে শিক্ষকের প্রথম ও প্রধান কাজ। শিক্ষক আন্তরিকতা ও একাগ্রতার মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, অনুশীলন প্রস্তুত, সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা গ্রহণ ও মূল্যায়ন এবং সহপাঠক্রমিক কার্যাবলী পরিচালনা করেন। শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ সাধনে সহপাঠক্রমিক কার্যাবলীর আয়োজন করা একজন শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একজন সুশিক্ষক অবশ্যই সুরসিক। তাঁর ক্লাশের পরিবেশ হয় প্রাণবন্ত, সজীব আনন্দরসে ভরপুর। কারণ তিনি জানেন- আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা। শ্রেণিকক্ষে রস থাকবে, শিক্ষা থাকবে, থাকবে নৈতিকতা, মূল্যবোধ, অংশগ্রহণ থাকবে, উপমা ও উদাহরণ থাকবে, থাকবে শাসন ও আদর। যে শ্রেণি কক্ষে এসব ব্যবস্থার অভাব থাকবে সে শ্রেণিকক্ষ হতে কিছু শোনা যাবে, লেখা যাবে কিন্তু কিছু শেখা যাবে না। সুশিক্ষক আন্তরিকতা, সততা ও নিষ্ঠার সাথে ক্লাসে পাঠদান করেন যাতে শিক্ষার্থীর আর আলাদা কোচিং বা প্রাইভেট টিউটরের প্রয়োজন না হয়। শিক্ষককে হতে হবে সৃজনশীল, গবেষণাধর্মী ও সৃষ্টিশীল। হতে হবে নিবেদিত প্রাণ।

প্রশ্ন জাগে শিক্ষকরা কি স্বাধীন? তাঁরা কি পারছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে? সমস্যা অনেক। শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনে অসঙ্গতি, মেধাবীদের শিক্ষকতায় অনাগ্রহ, নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীর্তি ও স্বজনপ্রীতি, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বিস্তর বৈষম্য। বেসরকারি শিক্ষকদের পদোন্নতির কোনো ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। না আছে চাকরির কোনো নিরাপত্তা, আবাসিক কোনো সুবিধা, ভ্রমণ ভাতা কিংবা বিনোদনের কোনোও সুবিধা। সুশিক্ষার জন্য সুশিক্ষক, মানসম্মত শিক্ষার জন্য আদর্শ শিক্ষক কথাটি তখনই যথার্থ হবে যখন নিম্নোক্ত পরামর্শগুলো বিবেচনায় আনা হবে এবং সফল বাস্তবায়ন হবে।

শিক্ষার সকল স্তরে মেধাবীদের নিয়োগ নিশ্চিত করা। মেধাবীরা যাতে শিক্ষকতায় নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে, স্বত্ব:স্ফূর্তভাবে তাঁদের মহান ব্রত পালন করতে পারে সে সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষকতা পেশার প্রতি তাদের আকৃষ্ট করতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও পরিচ্ছন্নতা অত্যাবশ্যক। সাফল্য নির্ভর করবে কাজের ওপর।

সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য দূর করা। বলা প্রয়োজন গুণগত শিক্ষার সত্যিকার হকদার বেসরকারি শিক্ষকরাই । পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল তারই প্রমাণ। সমান সুযোগ সৃষ্টি হলে আরও উজ্জ্বল সম্ভাবনার আশা করা যায়।

সর্বোপরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকদের জ্ঞান সমৃদ্ধ, কুশলী, দক্ষ ও চৌকষ করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই। বিদেশি প্রশিক্ষণ ও মনিটরিং এর ব্যবস্থা থাকলে গুণগত শিক্ষার পথ সুগম হবে। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রতি বছর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচন করে পুরস্কৃত করলে শিক্ষকদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হবে। শিক্ষকদের সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। শিক্ষকরা ভিন্নগ্রহের বাসিন্দা। এ ধরনের মনোভাবের পরিবর্তন করতে হবে। তাদের পেশার স্বীকৃতি দিয়ে আর্থিক স্বচ্ছলতার দিকটি নতুন করে ভাবতে হবে। নিতে হবে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ।

শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সংস্থা যারা শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করে তাদের সাথে সম্পৃক্ত থাকা একান্ত জরুরি। শেষ কথা হলো- যারা একান্ত ভালবেসে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে, জীবন-জীবিকার আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিয়েছেন, তাঁদের উচিত হবে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনে ব্রতী হওয়া। কারণ একজন সুশিক্ষক শুধুই একজন ছাত্রদের নয়, সমগ্র জাতির মূল্যবান সম্পদ। চরম ও পরম পাওয়া। আর কোনো বঞ্চনা বা করুণা নয় বরং সুশিক্ষার জন্য তথা গুণগত শিক্ষার জন্য প্রয়োজন শিক্ষকতা পেশার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করা এবং প্রয়োজনীয় সকল চাহিদা পূরণ করা। এটা সময়ের দাবি।

ভোরেরসিলেট/বিএ