আজ বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০ইং

বঙ্গবন্ধু হত্যায় মাওপন্থীদের ভূমিকাঃ এড. সুয়েব আহমেদ

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তি, বিশেষ করে পাকিস্তান-সমর্থনপুষ্ট মাওপন্থীরা, আওয়ামী লীগ সরকার-বিরোধি অপপ্রচার ও নাশকতামূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে প্রতিবিপ্লবের উপযোগী পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। সামরিক বাহিনীর উচ্চাভিলাষী একটি উপদল তার সুযোগ গ্রহণ করে। ১৫ই অগাস্ট তার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ষড়যন্ত্রকারীরা পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী খোন্দকার মোস্তাকে শিখণ্ডী হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে।

মাওপন্থীদের নাশকতামূলক কার্যকলাপ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু সচেতন ছিলেন। তিনি ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারী এবং ২৬শে মার্চ তারিখে প্রদত্ত দু’টি পৃথক ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-বিরোধীদের কার্যকলাপ সম্পর্কে দেশপ্রেমিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, এক দল লোক পাকিস্তান থেকে পাওয়া অস্ত্র দিয়ে নিরপরাধ লোককে হত্যা করছে; এমন কি পাঁচজন সংসদ সদস্যকে তারা হত্যা করেছে। তিন-চার হাজার রাজনৈতিক কর্মীকেও তারা হত্যা করেছে। এদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন। তারা বলেছিল, এই সরকারকে অস্ত্র দিয়ে উৎখাত করতে হবে। মুখে বলেছে তারা, আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, কিন্তু গোপনে তারা অস্ত্র জোগাড় করেছে। কেউ কেউ এখনও গোপনে বিদেশীদের কাছ থেকে পয়সা এনে বাংলার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এদের কেউ কেউ বাংলাদেশের নাম পর্যন্ত বলতে লজ্জাবোধ করে। তারা মানুষ হত্যা থেকে আরম্ভ করে রেল-লাইন ও ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরী ধ্বংস করে এবং জাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে দেশে এমন অবস্থা সৃষ্টি করেছে, যার সুযোগ নিচ্ছে বিদেশী এজেন্টরা। [১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারী জাতীয় সংসদে দ্বিতীয় বিপ্লব, জাতীয় ঐক্য গঠন ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং ২৬শে মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচী সম্পর্কে প্রদত্ত ভাষণ। (বাংলাদেশের সমাজবিপ্লবে বঙ্গবন্ধুর দর্শন, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, ১৯৭৯, পৃ. ২০৪-২২৫)]

১৯৭৪ সালের ২৮শে ডিসেম্বার রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে অরাজনৈতিকতাজনিত সঙ্কট মোকাবিলার জন্য সারাদেশে বঙ্গবন্ধু-সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় : ”অবাধ গণতন্ত্রসম্মত সুযোগের যে ভাবে অপব্যবহার হয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক তৎপরতার পরিবর্তে যে ভাবে নৈরাজ্য ও অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়েছে, দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়ে জাতীয় বিপর্যয় অনিবার্য করে তোলার জন্য সমাজ-বিরোধীরা যে ভাবে অশুভ তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে, নাশকতা, অন্তর্ঘাত ও সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপ এবং নির্বিচারে গুপ্ত-হত্যা চালিয়ে যে ভাবে জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতা, ভীতি ও ত্রাসের সঞ্চার করা হয়েছে, জনগণের নির্বাচিত ও আস্থাভাজন কোনো সরকারই তার মোকাবিলায় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারে না। সুপরিকল্পিত এই নৈরাজ্য, অরাজকতা ও সঙ্কট থেকে জাতিকে রক্ষা করার জন্য এই কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া সরকারের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না।” (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা”, ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া, ”আজকের কাগজ”, ২৭শে এপ্রিল, ১৯৯২)।

প্রতি বিপ্লবের মাধ্যমে যারা ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখছিলো, তাদের মধ্যে ছিল সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি, আব্দুল হকের পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি, মোহাম্মদ তোয়াহার সাম্যবাদী দল (মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট) এবং জলিল-রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল।

মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭২ সাল থেকেই প্রতিবিপ্লবের হুমকি দিচ্ছিলেন। ২৪শে অগাস্ট (১৯৭২) ঢাকার ”দৈনিক বাংলা”-য় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবিপ্লব আসন্ন। ন’মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়ার ফলে নিত্যপ্রয়োজীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কারণে জনসাধারণের মধ্যে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, তার সুযোগ গ্রহণ করে মওলানা ভাসানী মুজিব সরকারকে প্রতিবিপ্লবের হুমকি দেন। ওয়াকেবহাল মহল মনে করেন, মাওপন্থী, ধর্মান্ধ মোল্লা ও পাকিস্তানপন্থীদের উস্‌কে দিয়ে তিনি বাংলাদেশে প্রতিবিপ্লব ঘটাবার আয়োজন করছিলেন। (History of the Freedom Movement in Bangladesh, Jyoti Sen Gupta, p. 475.)

১৯৭২ সালের ৩রা সেপ্টেম্বার পুরানো পল্টনের এক জনসভায় মওলানা ভাসানী বলেন, জনগণের ইচ্ছায় সরকার পরিচালিত হবে; জনগণকে বাদ দিয়ে সরকার চলতে পারে না। তিনি দাবি করেন : ”সর্বদলীয় সরকার চাই; অন্ন-বস্ত্র দাও, না হলে গদি ছাড়।”
তিনি আরও বলেন, জনসাধারণের দুঃখ-দৈন্য দূর করার ব্যাপারে মুজিব সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এ-সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি গণপরিষদ ও মন্ত্রীসভা ভেঙে দিয়ে জাতীয় ‘কনভেনশান’ ডেকে জাতীয় সরকার গঠন করার আহ্বান জানান। সভা শেষে এক ভূখা-মিছিল নিয়ে তিনি গণভবনে গিয়ে একটি ১৮-দফা স্মারকলিপি পেশ করেন। (”গণকণ্ঠ”, ঢাকা, ৪ঠা সেপ্টেম্বার, ১৯৭২)
১৯৭১ সালে ”মুজিবনগর”-এ অবস্থানকালে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ সরকারের বৈধতা স্বীকার করে মুক্তিযু্দ্ধের সমর্থনকারী বিভিন্ন দল ও সংগঠনের প্রতিনিধিদের বলেছিলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পরাজিত দলের নেতাদের নিয়ে সর্বদলীয় মন্ত্রীসভা গঠন করা সম্ভব নয়। (”আজকের কাগজ”, ঢাকা, ২১শে এপ্রিল, ১৯৯২)

১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আওয়ামী লীগ সরকারের বৈধতার ভিত্তি অপরিবর্তিত থাকে সত্ত্বেও মওলানা ভাসানী সর্বদলীয় সরকার গঠনের দাবি উত্থাপন করেন।মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে খোন্দকার মোস্তাক ও মুজিব-হত্যাকারী সামরিক অফিসারদের যোগাযোগ সম্পর্কে বহু তথ্য ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফ্‌সুল্টজ্‌-এর আলোড়ন সৃষ্টিকারী বই ”বাংলাদেশ : দি আনফিনিস্‌ড্‌ রেভলিউশান”-এর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।

১৯৯৩ সালে প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বইতে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে বাংলাদেশের মাওপন্থীদের সরাসরি যোগাযোগ এবং মুজিব-বিরোধী কার্যকলাপ পরিচালনার জন্য অর্থ, অস্ত্র ও বেতারযন্ত্র সরবরাহ সম্পর্কে একটি প্রামাণ্য দলিলের কথা উল্লেখ করা হয়।
জুলফিকার আলী ভুট্টোর জীবনীকার মার্কিন অধ্যাপক স্ট্যানলী ঔলপার্ট ”জুলফি ভুট্টো অব পাকিস্তান : হিজ লাইফ এ্যান্ড টাইমস” বইতে লিখেছেন, দু’বছর যাবৎ ভুট্টো কয়েকটি মুজিব-বিরোধী দলকে তাঁর গোপন ”স্বেচ্ছাধীন তহবিল” থেকে অর্থ-সাহায্য অব্যাহত রাখেন। বাংলাদেশের রাজনীতির জনাকীর্ণ বর্ণালীর উভয় দিকে অবস্থানকারী দলগুলির মধ্যে ইসলামিক মৌলবাদী ও মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট বাঙালীরা এসময় একজোট হয়ে মুজিব সরকারের সমালোচনায় মুখর হয়। পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট)-এর জেনারেল সেক্রেটারী আব্দুল হক ”গভীর বেদনা ও নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণা” প্রকাশ করে ”প্রিয় প্রধানমন্ত্রী” ভুট্টোকে ১৯৭৪ সালের ১৬ই ডিসেম্বার তারিখে লিখিত এক চিঠিতে ”জনগণের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সম্পর্কচ্যুত মুজিবের পুতুল-সরকার”-এর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ”অর্থ, অস্ত্রশস্ত্র এবং বেতারযন্ত্র” সরবরাহের আবেদন জানান। উক্ত ”সর্বোচ্চ গোপনীয় ও অত্যন্ত জরুরী” চিঠিখানি ১৯৭৫ সালের ৬ই জানুযায়ী ভুট্টোর হাতে পৌঁছায়। তিনি চিঠির পাশে ”জরুরী” শব্দটি লিখে এই ”সৎ ব্যাক্তি”-কে ”সাহায্য” দানের অনুমতি দেন। পত্র লেখকে ভুট্টো ”স্পষ্টতঃ করিৎকর্মা” বলে মনে করেন।

[”Bhutto had been funneling secret ‘discretionary’ funds to several anti-Mujib parties during the past two years, and before the end of August, 1975 that investment would pay off handsomely. Orthodox Islamic as well Marxist Communist Bangalis on both wings of the cluttered spectrum of Bangladeshi politics now combined in an opposition chorus to Mujib’s inept, tottering regime. Abdul Huq, General Secretary of Bangladesh’s Marxist-Leninist Communist Party, had written on 16 December, 1974 to ‘My dear Prime Minister’ Bhotto with ‘much pain and anguish’ to appeal ‘for funds, arms and wireless instruments’ to use against the ‘puppet Mujib clique…today totally divorced from the people.’ That ‘TOP SECRET/MOST IMMEDIATE’ letter reached Zulfi on 16 January, 1975, when he minuted on its margin ‘Important,’ authorising ‘help’ for this ‘honest man,’ whom Bhutto rated as ‘fairly effective’. (Zulfi Bhutto of Pakistan : His Life and Times, Stanley Wolpert, p.248)]
ঢাকা থেকে লিখিত আবদুল হকের চিঠিখানি প্রধানমন্ত্রী ভুট্টোর বিশেষ উপদেষ্টা ও মন্ত্রী মর্যাদাভোগী মাহমুদ আলীর মাধ্যমে পাঠানো হয়। সরকারী নথিভুক্ত করে চিঠিখানি তিনি ভুট্টোর কাছে পাঠান।
[Ref :PS/MS/8-75, Islamabad, 6 January, 1985. The original letter is in Bhutto Family Library and Archives, 70 Clifton, Karachi. (Zulfi Bhutto of Pakistan : His Life and Times, Stanley Wolpert, foot-note No. 3., p. 350)]

উল্লিখিত বইতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বানচাল করার ষড়যন্ত্রে নিয়োজিত ভুট্টোর আরও একজন এজেন্ট আবদুল মালেক সৌদী আরবে গিয়ে তাঁর সঙ্গে পত্র-মারফত যোগাযোগ করে। ”প্রিয় মি. ভুট্টো” সম্বোধন করে ২২শে জানুয়ারী (১৯৭৫) তারিকে লিখিত পত্রে সে বাংলাদেশের ”সাড়ে-ছ’কোটি মুসলমানদের মু্ক্তি”-র ব্যাপারে তাঁর কাছে সাহায্যের আবেদন জানায়। পত্রে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের মুসলমানরা ”আপনার নির্দেশ ও নেতৃত্বের অপেক্ষায় রয়েছে।”
[Abdul Malek’s letter to Bhutto, from Saudi Arabia, 22 January, 1975. The original letter is in Bhutto Family Library and Archives. (Zulfi Bhutto of Pakistan : His Life and Times, Stanley Wolpert, foot-note No. 4., p. 350)]
সংবিধান পরিবর্তন করে বাংলাদেশের ”ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ” নাম গ্রহণ এবং ”মুসলিম মনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ”-কে নিয়ে পাকিস্তানের মতো একটি ”এড্‌ভাইসারী কাউন্সিল” গঠন করার জন্য শেখ মুজিব কিংবা তাঁর উত্তরাধিকারীদের উপর চাপ প্রয়োগ করার উদ্দেশ্যে কূটনৈতিক ও আর্থিক সমর্থন আদায়ের জন্য ভুট্টো মওলানা নিয়াজীকে সৌদী আরব ও আমীরাত-এ পাঠান। (প্রাগুক্ত, পৃ.২৪৮)

১৯৭০ সালের শেষ দিকে মওলানা ভাসানীর ”ন্যাপ”-এর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে মাওপন্থী মোহাম্মদ তোয়াহা ও আবদুল হক পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট) নামে একটি দল গঠন করেন। এই গোঁড়া বামপন্থী দলটি বাঙালীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের বিরোধিতা করেন। এই উপলক্ষে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, মাওপন্থী দলগুলির মধ্যে একমাত্র তোয়াহা ও আবদুল হকের দল ১৯৬৮ সাল থেকে পরবর্তী কালের ক্রমবর্ধমান সঙ্কটে অন্যদের সঙ্গে একজোট হয়ে সংগ্রাম পরিচালনার বিরোধিতা করে। (Explosion in a Sub Continent : India, Pakistan, Bangladesh and Ceylon, Tariq Ali, p. 316.)

মু্ক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উপ-মহাদেশের সঙ্কটের প্রকৃত রূপ সম্পর্কে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। আবদুল হক ও তাঁর সমর্থকরা দাবি করেন, পাকিস্তানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ানের সমর্পনপুষ্ট ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীরা এই সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। আবদুল হকের এই তথাকথিত ”থিসিস্‌” সম্পর্কে তোয়াহা পুরোপুরি একমত হননি বলে প্রকাশ। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার চার মাস পর পার্টি দ্বিধা-বিভক্ত হয়। আবদুল হক তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত উপ-দলের নাম থেকে ”পূর্ব পাকিস্তান” বাদ দিতে অস্বীকার করেন। তাঁর উপ-দল পাকিস্তানী সামরিক-শাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে আভাস দেয়, জনগণের উপর পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনীর পাশবিক আক্রমণ পরিহার করা হলে তারা আসন্ন ভারতীয় আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যাপারে সহায়তা করতে রাজী রয়েছে।
[”The crackdown by the Pakistan Army and the extent of its brutality made the independence of Bangladesh an irreversible certainty. Nevertheless, within the East Pakistan Communist Party (Marxist-Leninist) deep disagreement persisted over the party’s position in this the most wrenching crisis to grip the region. A faction led by Abdul Huw still agrued that the entire confrontation was the product of Indian expansionism backed by the Soviet Union with the sole intent of destroying the territorial integrity of Pakistan.” (Bangladesh : The Unfinished Revolution, Lawrence Lifschultz, p. 22.)]

তোয়াহার নেতৃত্বে পরিচালিত উপ-দল পূর্ব বাংলা সাম্যবাদী দল (মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ান কলকাতা-ভিত্তিক আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান সমর্থক বলে আবদুল হকের দাবির সঙ্গে একমত হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত জাতীয় মুক্তির আন্দোলনকে সমর্থন করা উচিত হবে কিনা, সে সম্পর্কে তোয়াহা মনস্থির করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তাঁর উপ-দল এমন একটি কৌশল গ্রহণ করে, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ”দু’মুখী যুদ্ধ”। তারা নাকি একদিকে পাকিস্তান বাহিনী এবং অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রতি অনুগত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। আওয়ামী লীগের অনুগত মুক্তিবাহিনী, নাকি পাকিস্তান বাহিনীকে তোয়াহা তাঁর প্রধান শত্রু হিসেবে বিবেচনা করেন, তা’ কখনো কখনো বোঝা কষ্টকর ছিল।
[”Toaha’s faction ultimately adoped a strategic position they termed a ‘two-way war’. On the one hand they fought the Pakistan Army and on the other they fought the forces loyal to the Awami League. At times it was difficult to ascertain whether Toaha regarded the Mukti Bahini forces, which he identified with the Awami League, or the Pakistan Army, to be the main enemy.” (Bangladesh : The Unfinished Revolution, Lawrence Lifschultz, p. 22.)]
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে তোয়াহার সাম্যবাদী দলের রংপুর শাখা শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ এবং মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে একটি ছাপানো প্রচারপত্র বিলি করে। এই প্রচারপত্রে বাংলাদেশের অধিবাসীদের সাবধান করে দিয়ে বলা হয়, শেখ মুজিব ও তাঁর আওয়ামী লীগ এবং মিসেস গান্ধীর কংগ্রেস পার্টি ”মহাচীনকে আক্রমণের ষড়যন্ত্র” করছে। এই প্রচারপত্রে বঙ্গবন্ধুকে ”আমেরিকার দালাল” বলে অভিহিত করা হয়। (History of the Freedom Movement in Bangladesh, Jyoti Sen Gupta, p. 218)

মুক্তিবাহিনীর গেরিলাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালানোর ব্যপারে পাকস্তানী-বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা সম্পর্কেও তোয়াহা নিজে নোয়াখালীতে নিয়োজিত পাকিস্তানী কর্নেল আসিক হোসেনের সঙ্গে আলোচনা চালান। শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। (Bangladesh : The Unfinished Revolution, Lawrence Lifschultz, p. 22.)

বাংলাদেশে স্বাধীন হওয়ার পর তোয়াহা ”বর্তমান পরিস্থিতি” সম্পর্কে এক বিবৃতিতে দাবি করেন, ১৯৬৭ সাল থেকে তাঁর পার্টি স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিল। তিনি বলেন, তাঁর পার্টি আইয়ূব-বিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত করে। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। আইয়ূবের স্বৈরশাসনকালে মাওপন্থীদের কী ভূমিকা ছিল, তা’ বাংলাদেশের জনগণের জানা আছে। মাওপন্থীরা শুধু আইয়ূব-বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেয়নি তা’ নয়, বরং তারা ”চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক” স্থাপনের জন্য আইয়ূব সরকারকে ”সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী” বলে দাবি করে। (Explosion in a Sub-Continent : India, Pakistan, Bangladesh and Ceylon, Tariq Ali, p. 319)

স্বাধীনতা অর্জনের পরেও তোয়াহা তাঁর পার্টির নামের সঙ্গে ”বাংলাদেশ” যোগ করতে অস্বীকার করেন। নামের আগে ”পূর্ব বাংলা” শব্দ দু’টি বাদ দিয়ে তাঁর পার্টি শুধু সাম্যবাদী (মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট) হিসেবে পরিচিত হয়। অবিলম্বে তিনি ”বৃহত্তর বাংলা” আন্দোলনের সূত্রপাত করেন।

তোয়াহার ”বৃহত্তর বাংলা” আন্দোলনের প্রতি মাওপন্থী চীনের সমর্থন ছিল। ১৯৭২ সালের গোড়ার দিকে বেইজিং-এ এক কূটনৈতিক সান্ধ্য-অনুষ্ঠানে জনৈক বাঙালী কূটনীতিবিদ (সম্ভবতঃ খাজা মোহাম্মদ কায়সার) চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি বলে দুঃখ প্রকাশ করেন। উক্ত কূটনীতিবিদ তখনও পর্যন্ত পাকিস্তানী দূতাবাসের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বাঙালী কূটনীতিবিদদের আক্ষেপের উত্তরে জনৈক উচ্চপদস্থ চীনা অফিসার তোয়াহার ”বৃহত্তর বাংলা” পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে বলেন, চীন তা’ সমর্থন করবে। (Who Killed Mujib?, A.L. Khatib, p. 169)

স্বাধীন বাংলাদেশে আবদুল হকের বিরুদ্ধে পাকিস্তানী সামরিক-বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়। বাধ্য হয়ে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট) আত্মগোপন করে সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপ চালিয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর আমলে বহু সন্ত্রাসমূলক ঘটনার সঙ্গে আবদুল হকের পার্টি জড়িত ছিল। পাকিস্তানের সঙ্গে, বিশেষ করে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করেন। ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বার মাসে বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সন্ত্রাসবাদী দলের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর সহকর্মীরা পরস্পর-বিরোধী ছোট ছোট উপদলে বিভক্ত হয়ে দক্ষিণ বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে তাদের সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়ার সংবাদ এখনও (১৯৯৮ সালে) ঢাকার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট মুজিব-হত্যার পর যাঁরা বক্তৃতা, বিবৃতি ও সংবাদপত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সরাসরি কিংবা প্রকারান্তরে সমর্থনসূচক মন্তব্য করেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাম্যবাদী দল (মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট)-এর নেতা মোহাম্মদ তোয়াহা।
মুজিব-হত্যায় তোয়াহার সাম্যবাদী দলের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল কিনা তা’ জানা যায়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশ তাঁর কাম্য ছিল, একথা সহজেই বোঝা যায়।

পরবর্তীকালে মুজিব-হত্যা সম্পর্কে মন্তব্য প্রসঙ্গে তোয়াহা বলেন : ”তাঁর মৃত্যুতে আমি ব্যথিত হই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁর এই মৃত্যুকে জনগণ কি ভাবে নিয়েছে? প্রকৃতপক্ষে জনগণ তখন ভেবেছে, এই বুঝি ভারতের হাত থেকে মুক্তি পেলাম।”
[১৯৮৫ সালের ২৩শে নভেম্বার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের মিলনায়তনে ”সাতই নভেম্বার ও সমকালীন রাজনীতি” শীর্ষক এক আলোচনা-সভায় মোহাম্মদ তোয়াহা উল্লিখিত মন্তব্য করেন। (সাপ্তাহিক ”সুরমা,” লন্ডন, ৯ই-১৫ই ডিসেম্বর, ১৯৮৫)]

১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বার জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা-দখলকে তোয়াহা পরোক্ষভাবে সমর্থন করেন। বছর খানেকের মধ্যে মাওপন্থীরা জেনারেল জিয়াকে সমর্থনদানের জন্য এগিয়ে আসে।
বাংলাদেশে মাওপন্থীদের কার্যকলাপ সম্পর্কে বোম্বের ”ইকনামিক এ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলী” পত্রিকায় ১৯৭৬ সালের ২৪শে এপ্রিল তারিখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের সমর্থকদের মধ্যে জামাতে ইসলামী থেকে শুরু করে মাওপন্থীদের এক বিস্ময়কর সমাবেশ দেখা যায়। …. এক সাংবাদিক সাক্ষাৎকারে জিয়াউর রহমানকে সমর্থন জানিয়ে বৃহত্তম মাওপন্থী দলের নেতা মোহাম্মদ তোয়াহা ঘোষণা করেন।, একটি প্রতিবেশী দেশ (অর্থাৎ ভারতবর্ষ) এবং সোভিয়েত ষড়যন্ত্রকারীরা (বাংলাদেশের) সৈন্যবাহিনীর বিভিন্ন স্তরের মধ্যে ব্যবধানের জুজু আবিষ্কার করে সাধারণ সৈনিক ও জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষ ও বিরোধের বীজ বপনের চেষ্টা করছে। তিনি আরও বলেন, এই ”ক্রমবর্ধমান শ্রেণী-ব্যবধান”-এর চতুর যুক্তিপ্রয়োগ করে সোভিয়েত ”সামাজিক-সাম্রাজ্যবাদীরা” এই দেশকে (অর্থাৎ বাংলাদেশ) পুনর্দখল ও শোষণ করার চেষ্টা করছে।
[The despatch also said : The slogans today in Bangladesh is ”national resistance,” and the Right takes it up with as much enthusiasm as the Left, the religious Right is regrouping fast with official support…M.G. Tawab, chief of the Air Force and Deputy Martial Law Administrator says : ”The Bengali Muslims had suffered from crises becauses they had strayed away from the path of the Prophet and indulged in irreligiousness in the name of secularism.” (”Bangladesh : Palace Revolution Continued,” G.K. Mathieu, Economic and Political Weekly, Bombay, 24 April, 1976)]

১৯৭৬ সালের অক্টোবর মাসে এক সাক্ষাৎকারে তোয়াহা বলেন, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের সহায়তায় যে-সামাজিক-সাম্রাজ্যবাদ কাজ করছে, তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করাই হবে তাঁর পার্টির প্রধান কর্তব্য।
তিনি আরও বলেন, দেশপ্রেমিক ও রাজনৈতিক দলসমূহ, সৈন্যবাহিনী এবং বেসামরিক শাসন-কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে সোভিয়েত ”সামাজিক-সাম্রাজ্যবাদ”-এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনার জন্য একটি জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (মণি সিং), আওয়ামী লীগ, জাতীয় সমাজতন্ত্রী দল ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিকে (মুজাফ্‌ফরপন্থী) তিনি দেশপ্রেমিক পার্টি বলে স্বীকার করতে রাজী নন। অন্যরা, যারা তখনও রাজনৈতিক দল গঠনের অনুমতি পায়নি (অর্থাৎ মুসলিম লীগ ও জামাতে ইসলামী), তাদের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে তিনি রাজী আছেন। তাঁর পার্টির কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান সামরিক সরকারকে তিনি মিত্র বলে মনে করেন। (Weekly Holiday, 17 October, 1976)
১৯৮৫ সালের ৭ই নভেম্বার বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের (মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট) কেন্দ্রীয় কমিটির নামে প্রচারিত একটি প্রেস-বিজ্ঞপ্তিতে তাদের দলীয় সভার কার্য-বিবরণী দেওয়া হয়। এই বিবরণে বলা হয় : ”সভাপতি কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা ঐতিহাসিক ৭ই নভেম্বারের তাৎপর্য সম্পর্কে বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট (মুজিব-হত্যা দিবস) ও ৭ই নভেম্বার (জেনারেল জিয়ার ক্ষমতা দখল দিবস) আমাদের জাতীয় জীবনে দু’টি সুদূরপ্রসারী ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ১৫ই অগাস্ট সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমাদের মাতৃভূমি সম্প্রসারণবাদীদের কবলমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াশীল চক্রান্ত আমাদের মুক্তির পথে একাধিক বাধার সৃষ্টি করেছিল। তার বিরুদ্ধে সাম্যবাদী দল দেশপ্রেমিক নিষ্ঠার সাথে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম চালিয়ে এসেছিল। এ দেশের কৃষক-মজুরের সন্তানদের নিয়ে গঠিত সেনাবাহিনী জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে সেদিনের সংগ্রামে গৌরবজনক ভূমিকা পালন করেছিল। আমাদের জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে ইতিহাসের পাতায় ৭ই নভেম্বার তারই গৌরবোজ্জল স্বাক্ষর রেখেছে।” এরপর আক্ষেপ করে বলা হয়েছে, তাদের পার্টি এটা (জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম) যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেনি। (”অনিরুদ্ধ”, দৈনিক ”সংবাদ”, ২৩শে ডিসেম্বার, ১৯৯৪)

জিয়া ও এরশাদের স্বৈরাচারী সরকারের প্রতি তোয়াহার সুযোগ-সন্ধানী মনোভাব গণতান্ত্রিক মহলে সন্দেহের উদ্রেক করে। ১৯৭৬ সালের অক্টোবর মাসে জিয়ার সামরিক সরকারকে তিনি গণতন্ত্র উদ্ধারের সংগ্রামে মিত্র বলে ঘোষণা করেন। ১৯৮৬ সালের জানুয়ারী মাসে তিনি বলেন, এরশাদের সামরিক সরকারকে তিনি অবৈধ বলে মনে করেন না। ১৫ই জানুয়ারী এক সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত ১৫-দলীয় বিরোধী জোট এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত ৭-দলীয় বিরোধী জোট এরশাদ সরকারকে বৈধ মনে করে না। এই পরিস্থিতিতে তাঁর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, দেশ-বিদেশে এই সরকার স্বীকৃত হয়েছে ; তাই বৈধতার প্রশ্নে না গিয়ে এই সরকারকে ”পছন্দ করি না” বলাই সম্ভবতঃ যুক্তিযুক্ত হবে। (দৈনিক ”ইত্তেফাক”, ১৬ই জানুয়ারী, ১৯৮৬)

জুলফিকার আলী ভূট্টোর কাছে লেখা আবদুল হকের চিঠি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ-বিরোধীরা, বিশেষ করে মাওপন্থীরা, মাহমুদ আলীর মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে।
পঞ্চাশের ও ষাটের দশকে মাহমুদ আলী পূর্ব বঙ্গ-ভিত্তিক পাকিস্তান গণতান্ত্রিক দলের সেক্রেটারী-জেনারেল হিসেবে পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করেন। তিনি ধর্ম-নিরপেক্ষ রাজনীতি ও যুক্ত-নির্বাচন প্রথার (Joint electorate) সমর্থক ছিলেন। তাঁর সম্পাদনায় সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ”নও বেলাল” পত্রিকার মাধ্যমে তিনি ভাষা আন্দোলনকে জোরালো সমর্থন দান করেন। ষাটের দশকের শেষ দিকে তিনি বঙ্গবন্ধু ছ’-দফা-বিরোধী আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন।
১৯৭১ সালের অগাস্ট মাসে পাকিস্তান সরকার গণতন্ত্রী দলের নেতা মাহমুদ আলী ও তৎকালীন ”পাকিস্তান অবজারভার”-এর মালিক হামিদুল হক চৌধুরীকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাবার জন্য পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা সফরে পাঠায়। লন্ডন সফরকালে তাঁরা বিখ্যাত রয়াল ল্যাঙ্কাস্টার হোটেলে অবস্থান করেন। পাকিস্তান সরকার তাদের সফরের ব্যয়ভার বহন করে। ভাতাদান সম্পর্কিত সরকারী দলিলের ”ফ্যাক্সিমিলি” লন্ডনের সাপ্তাহিক পত্রিকা ”জনমত”-এর ৫ই সেপ্টেম্বার (১৯৭১) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

৫ই অক্টোবর (১৯৭১) জাতি সংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নিন্দাসূচক দীর্ঘ বক্তৃতাদান কালে পাকিস্তানী প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে মাহমুদ আলী তাঁর দেশের বিরুদ্ধে ভারত অঘোষিত যুদ্ধে নিয়োজিত রয়েছে বলে অভিযোগ করেন। শুধু পাকিস্তানের আত্ম-সংযমের ফলে এই যুদ্ধ ব্যাপকতা লাভ করেনি বলেও তিনি দাবি করেন। (”দি গার্ডিয়ান”, ৬ই অক্টোবর, ১৯৭১)

মাহমুদ আলী ও হামিদুল হক চৌধুরী পূর্ব বঙ্গে পাকিস্তানী হত্যাযজ্ঞে সাহায্যদানের জন্য সংগঠিত ”শান্তি কমিটি”-র সক্রিয়া সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল মূল ”শান্তি কমিটি”-র উদ্যোগে জোহরের নামাজের পর বায়তুল মোকাররম থেকে একটি মিছিলের আয়োজন করা হয়। এই মিছিল পুরানো ঢাকার প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে চকবাজার মসজিদের সামনে দিয়ে অগ্রসর হয়ে নিউ মার্কেটের মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন খাজ খায়েরউদ্দিন (”শান্তি কমিটি”-র আহ্বায়ক), গোলাম আযম, শফিকুল ইসলাম, পীর মোহসেনউদ্দিন (দুদুমিয়া), সৈয়দ আজিজুল হক (নান্না মিয়া), মাহমুদ আলী, আব্দুল জব্বার খদ্দর এবং এ টি সাদী প্রমুখ।

১৪ই এপ্রিল অনুষ্ঠিত নাগরিক ”শান্তি কমিটি”-র বৈঠকে ২১-সদস্যবিশিষ্ট একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়। মাহমুদ আলী এই কমিটির সদস্য মনোনীত হন। (”একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়”, দ্বিতীয় সংস্করণ, পৃ. ৩১-৩২, ৩৪, ৪৭-৪৯)
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাহমুদ আলী স্বদেশে ফিরে আসতে সাহস পাননি। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভূট্টোর পরামর্শদাতা হিসেবে তিনি স্থায়ীভাবে পাকিস্তানে বসবাসের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অনতিবিলম্বে তাঁকে প্রবাসী পাকিস্তানীদের (কার্যতঃ প্রবাসী বাঙালীদের) প্রতি নজর রাখার দায়িত্ব দিয়ে স্টেট-মন্ত্রী পদে নিয়োগ করা হয়। হামিদুল হক চৌধুরীও পাকিস্তানে বসবাস করতে বাধ্য হন। মুজিব-হত্যার পর জেনারেল জিয়ার অনুগ্রহে তিনি দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হন।

১৯৭৫ সালে মুজিব-হত্যার তিন সপ্তাহ পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে একত্রীকরণ সম্পর্কে ভূট্টোর বিশেষ পরামর্শদাতা হিসেবে মাহমুদ আলীকে ইসলামাবাদ থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়। তাঁরা আশা করেছিলেন, বিদেশ থেকে যথেষ্ট সমর্থন পাওয়া গেলে উভয় দেশের মধ্যে একটি ”কনফেডারেশান” গঠন করা সম্ভব হবে। কিন্তু তাঁদের আশা পূর্ণ হয়নি, তা’ বলাই বাহুল্য। (Zulfi Bhutto of Pakistan : His Life and Times, Stanley Wolpert, p. 256)

এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, মাহমুদ আলীর আদি নিবাস তৎকালীন সিলেট জেলায় এবং বিলেত-প্রবাসী বাঙালীদের অধিকাংশ সিলেট থেকে এসেছেন। অতএব, বাংলাদেশ-বিরোধী আন্দোলনে প্রবাসী বাঙালীদের সমর্থন লাভের উদ্দেশ্যে মাহমুদ আলীর দু’টি প্রস্তাব পাকিস্তান সরকার গ্রহণ করে। প্রথম প্রস্তাব অনুযায়ী তথাকথিত পূর্ব পাকিস্তান ”প্রবাসী সরকার” গঠন করা হয়। পাকিস্তানপন্থী প্রবাসী বাঙালী ব্যারিস্টার আব্বাস আলী উল্লিখিত ভুয়ো সরকারের ”উজিরে আজম” পদে নিয়োজিত হন। বলা বাহুল্য, এই প্রহসনে মাহমুদ আলীর অনুগ্রহভাজন ব্যক্তিরাই অংশ গ্রহণ করে। দ্বিতীয় প্রস্তাব অনুযায়ী রেডিয়ো পাকিস্তান থেকে প্রবাসী বাঙালীদের উদ্দেশ্যে সিলটী কথ্য-ভাষায় একটি নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়।

উল্লিখিত পরিকল্পনা দু’টি ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও মাহমুদ আলী ও তাঁর অনুগ্রহভাজন ব্যক্তিরা হাল ছেড়ে দেয়নি। পরবর্তীকালে তারা যুক্তরাজ্যে ”পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান পুনরায় একত্রীকরণ আন্দোলন” নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করে। ১৯৮৮ সালের অগাস্ট মাসে এই ভুঁইফোড় আন্দোলনের পক্ষে প্রচারিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় : ”১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে পূর্ব পাকিস্তান এলাকায় হিন্দুস্তানী আগ্রাসনবাদী এবং সম্প্রসারণবাদীরা ‘বাংলাদেশ’ নামের এক করদ-মিত্র বা আশ্রিত-রাজ্য স্থাপন করে।” উল্লিখিত বক্তব্য থেকে তথাকথিত আন্দোলনের সমর্থকরা মাওপন্থী ও ভারত-বিদ্বেষী বলে সহজেই চেনা যায়। একমাত্র তারাই ভারতকে ”আগ্রাসনবাদী ও সম্প্রদারণবাদী” হিসেবে চিহ্নিত করে।
স্বাধীনতা অর্জন করার কয়েক মাসের মধ্যেই আওয়ামী লীগের একটি অতি-বিপ্লবী গ্রুপ বঙ্গবন্ধুকে কৃত্রিম সমর্থনদানের আভাস দিয়ে নতুন সঙ্কট সৃষ্টি করে। তৎকালীন ছাত্র লীগের নেতা আ স ম আবদুর রব গণপরিষদ ভেঙে দিয়ে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে দেশ-প্রেমিক পার্টির সদস্যদের নিয়ে একটি সরকার গঠনের দাবি উত্থাপন করেন। তিনি সমাজতন্ত্রের বুলি আওড়ান এবং সংবিধানে পূর্ণ সমাজতন্ত্রের গ্যারান্টি দাবি করেন।

কিছুকাল পর এক জনসভায় তিনি বলেন : ”মুজিব, আপনি অস্ত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আপনি অস্ত্র ধরতে জানেন? আমরা অস্ত্র ব্যবহারের শিক্ষা পেয়েছি।” (Who Killed Mujib, A.L. Khatib, p. 156-7.)
১৯৭২ সালের ৩০শে অক্টোবর ছাত্র লীগের রব-সিরাজ গ্রুপের উদ্যোগে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠিত হয়। মেজর এম এ জলিল পার্টির সভাপতি এবং আ স ম আবদুর রব সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৬-৭)
১৯৭৩ সালে জাসদ-এর সাধারণ সম্পাদক গোপনে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে দেখা করে মুজিব সরকার-বিরোধী আন্দোলে তাঁকে নেতৃত্বদানের অনুরোধ জানান। মওলানা সাহেব তাঁকে বলেছিলেন : ”মুজিব বেঈমান, মীরজাফর, ওকে উৎখাত করতে হবে।” ১৯৮৮ সালের নভেম্বার মাসে রব এই তথ্য প্রকাশ করেন। তখন তিনি জাতীয় সংসদে তথাকথিত বিরোধী দলের নেতা। (সাপ্তাহিক ”দেশবার্তা,” লন্ডন, ২৫শে নভেম্বার-২রা ডিসেম্বার, ১৯৮৮)

১৯৭৪ সালের জানুয়ারী মাসে তাঁরা দেশে বিক্ষোভ ও জনসভা অনুষ্ঠান করেন। ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে তাঁরা পল্টন ময়দানে একটি জনসভায় গরম গরম বক্তৃতা দেন। এর ফলে উত্তেজিত জনতা মিন্টু রোডে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর সরকারী বাসভবন আক্রমণ করে। পাহারাদার পুলিশের সঙ্গে সংঘর্যের ফলে ৬জন (অন্য একটি হিসেব অনুযায়ী ৮জন) নিহত এবং আরো কয়েকজন আহত হয়। এই উপলক্ষে মেজর জলিল ও আবদুর রবসহ মোট ১৭জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। (Who killed Mujib, A.L. Khatib, pp. 158-159)

১৯৮১ সালের ২৭শে জানুয়ারী ঢাকায় জাতীয় কৃষক লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে প্রধান অতিথির ভাষণে আবদুর রব বলেন : ”আমরা ১৯৭২ সালে আবেগ আর বিক্ষোভ নিয়ে সংগঠিত হয়েছিলাম। আমরা শুধু শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে জনগণের কাছে বক্তব্য রেখেছি। আমরা বলেছিলাম, শেখ মুজিবকে উৎখাত করতে পারলে সমাজের পরিবর্তন হবে, সমস্যার সমাধান হবে, দেশে বিপ্লব সংঘটিত হবে। আমাদের ডাকে কর্মীরা জেলে গেল, গুলি খেল …. কিন্তু বিপ্লব দেখলাম না। কেন এমন হলো, তা’ আজ তাকিয়ে দেখার সময় এসেছে।” (”সাপ্তাহিক জাগরণ”, লন্ডন, ১৫ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৮১)

তিনি আরও বলেন : ”কর্মীদের মধ্যে হতাশা আসার আরও কারণ রয়েছে। আমরা আন্দোলন করেছি ; কিন্তু শত্রু কে, মিত্র কে, তা’ সঠিকভাবে চিহ্নিত করিনি। কোনো কোনো সময় শত্রুকে সাথে নিয়েই আন্দোলন করেছে, যার ফলে আমরা আন্দোলনকে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে পারিনি।” (প্রাগুক্ত, ১৫ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৮১)

সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সরকারের ভিত্তিমূল দুর্বল করে জাসদ প্রকারান্তরে মাওপন্থীদের সহায়তা করে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী সামরিক গ্রুপও এর সুযোগ গ্রহণ করে, এ সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ নেই।

চলবে…

লেখকঃ এডভোকেট সুয়েব আহমদ, আইনজীবী, সমাজকর্মী, কলামিস্ট, রাজনীতিবীদ ।

আজকের সংবাদ