আজ বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০ইং

‘বন্ধন’-শাহনাজ চৌধুরী (পর্ব-৪)

[ধারাবাহিক (পর্ব-৪)]

মায়ের ভাবনা কিছুটা হলেও আমার মনে গিয়ে বাসা বাধলো, কারণ (আমাদের বিয়ের মাস খানেক পরেই বঙ্গবাজার মার্কেটে আগুন লেগেছিল। অনেকের সাথে আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। ব্যবসায়ী পার্টিরা বাকি টুকু বেইমানি করেছে, সব হারিয়ে ও স্বামী আমাকে সান্ত্বনা দিলেন। তুমি আমার পাশে থাকলে, জীবনের সব যুদ্ধে জয়ী হতে পারবো। কিছু দিনের মধ্যেই সৌদিআরবের একটা ভিসার খবর পেলেন আমার বড় দুলাভাই। তার বন্ধুর মাধ্যমে, আমাদের কেউ সৌদি ছিলেন না ঐ সময়। তাই দালালের কথা বিশ্বাস করা ছাড়া উপায় ছিল না। মূলত শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলাম, সবার সাথে দেখা করতে) যাইহোক শ্বশুরবাড়ি থেকে ফেরার তিন সপ্তাহ পরে ভাগ্যে পরিবর্তনের আশায় আমার স্বামী প্রবাসী হলেন। যাবার আগে আমার পরিবারের সবাইকে অনুরোধ করলেন। আমার প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে। কারণ হচ্ছে এই অল্প দিনেই উনি বুঝতে পেরেছেন, সবার প্রতি দায়িত্ব পালন সঠিকভাবে করলে ও আমি নিজের কথা একদম ভুলে যাই। তাছাড়া ঐ সময় আমি প্রেগনেন্ট ছিলাম, তাই আমার জন্য তার এত চিন্তা।

উনি সৌদি যাওয়ার পরে তার কোন খোঁজ খবর পাই না। সবাই খুব চিন্তিত হয়ে পরলাম। প্রায় এক মাস পরে গভীর রাতে ফোন আসলো। আমাকে চাইলেন, আমি ফোন ধরতেই বললেন তিনি পাঁচ মিনিটের বেশি কথা বলতে পারবেন না। তাই তার কথাগুলো যেন মন দিয়ে শুনি। বললাম ঠিক আছে, উনি যা বললেন তা হলো (যে দালালের মাধ্যমে তাকে পাঠানো হয়েছে, সেই দালাল এক ভিসা দিয়ে দুইজনকে পাঠিয়েছে এবং সৌদিআরব যাওয়ার পরে ঐ মালিক উনার পাসপোর্ট নিয়ে নিয়েছেন। এখন তিনি পালিয়ে আছেন, পুলিশের হাতে ধরা পরলে জেলে যেতে হবে) তোমার সাথে যদি আর দেখা না হয়, আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি তোমার জীবন টা নষ্ট করে দিলাম। এই বলে কাঁদতে লাগলেন। আমি শুধু বললাম, আল্লাহ্ আছেন। তিনি সব দেখেন, আল্লাহ্ আপনার সহায় হবেন। কথা শেষ হতে না হতেই লাইন কেটে গেল। আমি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। মা জানতে চাইলেন, কি হয়েছে? সব শুনে মায়ের মন খুব খারাপ হয়ে গেল। বললেন, আচ্ছা তুই এইসব নিয়ে টেনশন করিস না। আল্লাহ্ সব ঠিক করে দিবেন। পরের দিন দুলাভাই সেই দালালের কাছে গেল, এরপরে অনেক কিছুই হলো। কিন্তু আমার স্বামীকে সাহায্য করবার মতো কোন রাস্তা খুঁজে বের করা গেল না। অন্যরকম এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তা জীবনকে বিস্বাদময় করে তুলতে লাগলো। ভুলেই গেলাম আমি মা হতে চলেছি এমন কি রুটিন মেনে ডাক্তারের কাছে গেলেও নিজের প্রতি একটা অনীহা চলে আসলো। শুধু খেয়াল থাকলো শ্বাশুড়ীর যেন কোন কষ্ট না হয়। তিনি যেন কোনভাবেই এইসব জানতে না পারেন।

জীবনের শুরুতে একের পর ঝড়ের থাবায়, ভিতরে ভিতরে আমি দুমরে মুচড়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে গেলাম। বিষন্নতা একটি রোগ, আর এই রোগে আক্রান্ত হলাম। ডেলিভারির সময় ঘনিয়ে আসলো। সেই সময়েও অবরোধ চলছিল। অনেক দুর্বিষহ সময় পার করে সন্তান (ছেলে) ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর পরই মারা গেল। আর কিছুই মনে নেই, মেজ ভাইয়ের কান্নার শব্দে হুশ পেলাম, শুনলাম মেজ ভাই কেঁদে কেঁদে বলছেন, আল্লাহ্ তুমি কি অন্য আর কাউকে চোখে দেখ না। একজনই কি আছে তোমার দুনিয়ায়? চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না আমার। কারো সাথে কথা বলতেও ভালো লাগতো না, সঙ্গী হলো বই (বই আমি আগে ও পড়তাম)

এর প্রায় এক মাস পরে আমার স্বামী সৌদিআরব থেকে ফিরলেন। একটু সন্ধ্যা সন্ধ্যায় বাসায় আসলেন। তখনো আমি আমার রুমে শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিলাম, মা এসে আমাকে ডাকলেন, আমি ভাবলাম চায়ের জন্য হয়তো, বললাম এখন না পরে খাবো। দেখ কে এসেছে, আমি ঘাড় বাকা করে চাইলাম। তাকে দেখলাম, কিচ্ছু বললাম না। উনিও দেখলেন তার প্রাণবন্ত তাজা গোপাল একেবারে প্রাণহীন।। মায়ের সামনেই আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে খুব কাদলেন, বললেন, তুমি আমি বেঁচে আছি এই আল্লাহর অশেষ রহমত। সারা পৃথিবীর বিনিময়ে আমি তোমাকে চাই। আমরা আবার নতুন করে সব শুরু করবো…

পরের দিন আমাকে নিয়ে গেলেন বিশেষজ্ঞের কাছে। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পরে ডাক্তার আমার স্বামী কে বললেন, বৌ যদি বাঁচাতে চাও, তাহলে খুব ভালো করে সেবা যত্ন করতে হবে। সব সময় খুশি রাখতে হবে। সুস্থ হতে একটু সময় লাগবে, আবার সন্তান জন্ম নিলে তবেই পুরোপুরি সুস্থ হবে। সপ্তাহ পরে আমরা সিলেট রওয়ানা দিলাম, কারণ সৌদি থাকতেই তিনি মানত করে ছিলেন, তাই প্রথমে সিলেট হয়ে পরে শ্বশুরবাড়ি গেলাম। আমার অবস্থা দেখে তো সবাই কান্না কাটি শুরু করে দিলেন। আমি একেবারে বোবা, অনুভূতিহীন। যারা প্রথম বার আমাকে এত বোকা বানিয়ে হেসেছে। আমার অবস্থা দেখে তাদের চোখেও পানি এলো। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি হাঁটতে হাঁটতে ঢেকি ঘরের সামনে গেলাম, দেখলাম ঢেকি টা আর নাই। আমার পিছু পিছু শ্বাশুড়ী ও ছিলেন। তার দিকে তাকাতেই বললেন সেবার সবাই তোমাকে কষ্ট দিয়েছিল, তাই আমি ঢেকি তুলে অন্যদের বাড়িতে দিয়ে দিয়েছি। কালের ঐতিহ্যের একমাত্র চিহ্ন আমার জন্য সরিয়ে দিয়েছেন। মুখে কিছু বললাম না, ছোট ননদ ডাকলো, ভাবী আসেন হাঁসের বাচ্চাকে ছাড়বো (প্রথমবারে হাঁসের বাচ্চাদের পিছু পিছু আমি দৌড়ে পুকুর পাড়ে যেতাম, সিঁড়ি তে বসে পানিতে তাদের খেলা দেখতাম) বললাম ভালো লাগে না। পিচ্চিবাহিনী এলো, আমার সাথে সাথে থাকলো। কিন্তু আমি তো আর আগের মতো চঞ্চল হরিণী নাই। শ্বাশুড়ী দেবরকে দিয়ে দড়ি বেঁধে দোলনা বানিয়ে দিলেন। আমার তো আর এইসব ভালো লাগে না। কিন্তু প্রথমবারে শ্বাশুড়ী শুধু বলতেন মানুষ কি বলবে? আর আমি বলতাম বলুক। এখন সবকিছুতেই আমি বলি মানুষ কি বলবে শ্বাশুড়ী বলেন বলুক। রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল, শ্বাশুড়ী নামাজে মোনাজাতে কাঁদতে কাঁদতে বলতেছেন। আল্লাহ্ সারা জীবন যত কষ্ট দিয়েছ, কখনো উহ্ করি নাই। ভাগ্যের লিখা মেনে নিয়েছি। চোখের সামনে নিজের সম্পত্তি অন্যে ভোগ করতেছে। সন্তানের জীবনের বিনিময়ে বুকে পাথর চেপে বসে আছি। যেই সন্তান বাঁচাতে সব হারালাম। সেই সন্তানের মুখের হাসি তুমি ফিরিয়ে দাও। আমার ভালো কাজের বিনিময়ে বৌ মাকে সুস্থ করে দাও। আমি চুপচাপ তার দোয়া শুনছিলাম, কান্না ও পাচ্ছে।।

পরের দিন দুপুরের আগে হঠাৎ খুব জোরে বৃষ্টি শুরু হলো। আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে বৃষ্টি দেখতেছিলাম। পুকুরের পানিতে বৃষ্টির ফোঁটা পরে আবার মিশে যায়। জীবনের প্রথমে এমন দেখলাম, মন দিয়েই উপভোগ করতেছিলাম। শ্বাশুড়ী হয়তো খেয়াল করলেন। পিছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে গিয়ে আমার পিচ্চিবাহিনীকে ডেকে আনলেন। পিচ্চিবাহিনী আমাকে জোর করে বিছানা থেকে টেনে তুলে বললো, বৃষ্টি দেখতে হলে ভিজতে হয়। শরীর মন দুই-ই দুর্বল তাই তাদের সাথে পারলাম না। উঠানে যেতেই পা পিছলে পড়ে গেলাম। কোনমতে উঠতে গিয়ে দেখি, আমার পিচ্চিবাহিনী আমার চারপাশে গোল হয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে (প্রথমবার এটা ছিল পিচ্চিবাহিনীর জন্য ভুলের শাস্তি। এই জন্য শ্বাশুড়ী বলেছিলেন ওদের মা বাবা মনে কষ্ট পাবে, শাস্তিটা যেন বদলে দেই) একজন আমাকে ইশারা করলো পিছনে দেখতে। আমি পিছনে তাকিয়ে দেখি আমার শ্বাশুড়ী স্বয়ং কান ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি লজ্জা পেয়ে হেসে বললাম আল্লাহ্ আমাকে গুনাহ দিবেন তো! শ্বাশুড়ী আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদলেন বললেন এই একটু হাসির জন্য আজ চারদিন কত চেষ্টা করতেছি। তোমার মনে রাখা দরকার তুমি একা না, আমরা সবাই তোমার, আমরা সবাই মিলে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে বাঁচবো। তোমার জন্য না হোক আমাদের জন্য তোমাকে বাঁচতে হবে মা…

আল্লাহর রহমতের মেঘের সাথে শ্বাশুড়ীর চোখে পানি ধুইয়ে মুছে দিল বিষন্নতার সব গ্লানি।।

চলবে…

ভোরেরসিলেট/বিএ

বিশ্বনাথে সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেফতার

‘আমার ডায়েরি’-সুমাইয়া আক্তার

“নশ্বর পৃথিবী”-শাহারা খান

আজকের সংবাদ