আজ রবিবার, আগস্ট ৯, ২০২০ইং

করোনায় মানুষের মধ্যে নগদ টাকা ধরে রাখার প্রবণতা বেড়েছে

ভোরের সিলেট ডেস্ক
মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে মানুষের মধ্যে নগদ টাকা ধরে রাখার প্রবণতা বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ব্যাংকবহির্ভূত অর্থের পরিমাণ তথা জনগণের হাতে থাকা টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এপ্রিল থেকে জুন এই তিন মাসেই বেড়েছে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ করোনা সংক্রমণ শুরুর গত তিন মাসেই পুরো অর্থবছরের প্রায় অর্ধেক অর্থ জনগণের হাতে গিয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং ব্যাংকের বাইরের মুদ্রা বৃদ্ধির মূল কারণ করোনাভাইরাস। দেশে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই সঞ্চয়ের অভ্যাস প্রত্যাহার করে নিজের হাতে টাকা রাখতে পছন্দ করছেন দেশের মানুষ। কারণ কভিড চলাকালীন পরিস্থিতিতে চাকরি হারিয়েছেন অনেকেই। যাঁদের চাকরি আছে তাঁদের মধ্যে অনেকের বেতন কমে গেছে বা ঠিকমতো বেতন পাচ্ছেন না। করোনাসহ বিভিন্ন কারণে এতে ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধিও কমছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘করোনার কারণে কাজ হারানোর পাশাপাশি আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই এখন সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। এ ছাড়া সংক্রমণ দীর্ঘায়িত হওয়ায় অনেকেই টাকা তুলে হাতে রেখেছেন এবং রাখছেন। এ ছাড়া ব্যাংকে টাকা কম রাখার বড় কারণ হলো আমানতের সুদ কমে গেছে। এখন ব্যাংকে টাকা রেখে যে সুদ পাওয়া যাচ্ছে তা মূল্যস্ফীতির কাছাকাছি। এর ওপর উৎস কর ও আবগারি শুল্ক তো আছেই। ফলে ব্যাংকে টাকা রেখে প্রকৃত অর্থে মুনাফা ঘরে তোলা কঠিন হয়ে গেছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছরের জুন মাস শেষে ব্যাংকবহির্ভূত টাকার অঙ্ক দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯২ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা। এক বছর আগে ২০১৯ সালের জুন শেষে এটা ছিল এক লাখ ৫৪ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। এর ফলে গত অর্থবছরে ব্যাংকবহির্ভূত টাকার পরিমাণ বেড়েছে ৩৮ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ২৪.৬৯ শতাংশ। এর মধ্যে এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসেই বেড়েছে ১৯ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘করোনার কারণে মানুষের আয় কমেছে। চাকরি হারিয়েছেন অনেকেই। ফলে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন মানুষ। এ ছাড়া বিভিন্ন কারণে ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে। আবার এখন ব্যাংকে টাকা রাখলে সুদ পাওয়া যাচ্ছে অনেক কম। এসব কারণে ব্যাংকে টাকা রাখা কমেছে।’

করোনাভাইরাসের পর থেকে ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে। চলতি বছরের জুন শেষে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০.৯৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৮১ হাজার ২৫ কোটি টাকা, যা ২০১৯ সালের জুনে ছিল ১০ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে গত এক বছরে আমানত বেড়েছে এক লাখ ১৬ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা। অথচ গত এপ্রিল পর্যন্ত আমানতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১১.৮৮ শতাংশ। আর গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বার্ষিক এই প্রবৃদ্ধি ছিল ১২.৫৭ শতাংশ।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘করোনা মানুষের জীবন-জীবিকায় বড় প্রভাব ফেলেছে। চিকিৎসাসহ জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে। কখন কী হয় না হয় এমন অনিশ্চয়তা থেকে অনেকেই টাকা তুলে হাতে রাখছেন। আবার নতুন করে ব্যাংকে টাকা রাখতেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন কম। মোটকথা, করোনাভাইরাসের কারণে আমানতের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।’

ভোরের সিলেট/কালের কন্ঠ/টিএ