আজ রবিবার, আগস্ট ৯, ২০২০ইং

বিতর্কের মুখে আওয়ামী লীগের উপ-কমিটিগুলো

ভোরের সিলেট ডেস্ক
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন বিভিন্ন পেশার কিছু ব্যক্তি। অনেকে গ্রেফতার হয়েছেন, কেউ মামলার মুখোমুখি হয়েছেন, আবার কেউ কেউ পালিয়েও বেড়াচ্ছেন। ব্যক্তি সমালোচনার পাশাপাশি তাদের আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও বিতর্কের ঝড় বইছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলছেন, এরা প্রায় সবাই হাইব্রিড। দলের দুঃসময়ের কর্মী নন। এছাড়া বড় পদেও নেই তারে কেউ। এদের বড় একটা অংশ ঠাঁই নিয়েছে দলের উপ-কমিটিতে। এ কারণে শুরু থেকেই কমবেশি বিতর্কে পড়েছে দলের বিষয়ভিত্তিক এ উপ-কমিটিগুলো।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান বলেন, ‘কিছু ব্যক্তি থাকেন যারা সবসময় সরকারি দল করে থাকেন। এমন কেউ কেউ ফাঁক-ফোকর দিয়ে আওয়ামী লীগেও ঢুকে পড়েছিল। কারণ আওয়ামী লীগ এতো বিশাল ও সুবিস্তৃত দল যে, সবকিছু সবসময় নজরদারিতে রাখা কঠিন হয়ে যায়। তবে অতীতে যাই হোক, আর কাউকে দলের সুনাম নষ্ট করতে দেওয়া হবে না।’ করোনাকাল কেটে গেলে দলীয় ফোরামে বিষয়টি নিয়ে জোরালো আলোচনা করবেন বলে জানান তিনি।

উপ-কমিটি সংক্রান্ত সর্বশেষ যে নামটি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে-তিনি অপরাজিতা ইন্টারন্যাশনালের মালিক শারমিন জাহান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নকল মাস্ক সরবরাহের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগের গত কমিটির (২০১৬-২০১৯) মহিলা ও শিশু বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য ছিলেন। তবে তিনি দলের ত্যাগী ও সংগ্রামী কর্মী হিসেবে পরিচিত। ঢাকা বিশ্বদ্যালয়ের একটি হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ২০০১ পরবর্তী সময়ে ঢাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দুঃসময়ে রাজনীতি করেছেন। রাজপথে ছিলেন বিএনপি-জামায়াত জোটবিরোধী আন্দোলনেও।

এদিকে, করোনার পরীক্ষা জালিয়াতিকাণ্ডে গ্রেফতার হওয়া মো. শাহেদ আওয়ামী লীগে ছিলেন সুমসয়ের পাখি। তিনি দলটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিটির (২০১৬-২০১৯) সদস্য ছিলেন। এ রকম আরও কিছু বিতর্কিত ব্যক্তি আওয়ামী লীগের এই কমিটির বিভিন্ন উপ-কমিটিতে ছিল। যেমন ‘ভূমিদস্যু’ হিসেবে খ্যাত ও অনেক অপকর্মে অভিযুক্ত আশুলিয়ার ফারুক আহম্মদ (জাপানি ফারুক) শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক ছিলেন। এর আগে তারও দলে কোনও সংশ্লিষ্টতা ছিল না। কৃষি বিষয়ক উপ-কমিটিতে ছিলেন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিবির নেতা। যিনি আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির এ পদ দিয়ে তার শিবির সংশ্লিষ্টতা আড়াল করে আবার একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে চাকরি বাগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন।

এমন আরও কিছু ব্যক্তি হলেন-আওয়ামী লীগের সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেনের নেতৃত্বে উপকমিটির সহ-সম্পাদক রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক নেতা মাহমুদুল আছাদ রাসেল। একই উপকমিটির সহ-সম্পাদক পদ ছিলেন ইতালি বিএনপির সাবেক নেতা আমান উল্লাহ আমান। রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর উপকমিটির সহ-সম্পাদক সেলিম রেজা সুইট পাবনা জেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্য ছিলেন। একইভাবে ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের উপকমিটির সহ-সম্পাদক এইচএম মিজানুর রহমান জনী ঢাকা কলেজের ছাত্রদলের সিরাজ গ্রুপের সাবেক ক্যাডার। জনীর বাবা আবদুল হক বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছিলেন।

দলের দফতর উপকমিটির সহ-সম্পাদক পদ পাওয়া অ্যাডভোকেট ফয়সাল আহমেদ রিয়াদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের ক্যাডার। একই উপকমিটির সহ-সম্পাদক ছিলেন ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদের ক্যাডার কে এম কবির হোসেন এবং ‘জিপসি রুবেল’ নামে পরিচিত সাবেক ছাত্রদল ক্যাডার তানভীর হোসেন রুবেল। কবির ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সাংস্কৃতিক সম্পাদক এবং রুবেল সাবেক সদস্য।

সংস্কৃতিবিষয়ক উপকমিটির সহ-সম্পাদক হয়েছিলেন ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের আরেক সাবেক সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা সঙ্গীতশিল্পী এসডি রুবেল। অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপকমিটির সহ-সম্পাদক ছিলেন জিয়াউল আবেদীন, যিনি ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের ক্যাডার ছিলেন। একই উপকমিটির সহ-সম্পাদক এসএম সাইফুল্লাহ আল মামুন খুলনার কয়রা উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক নেতা। এ কমিটি হওয়ার পর ২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সভাপতির ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক বাদ পড়া ত্যাগী ও নিবেদিত নেতাকর্মীদের বিক্ষোভের মুখেও পড়েছিলেন তিনি।

আওয়ামী লীগের উপ-কমিটি গঠনের এই প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০৯ এর সম্মেলন থেকে। নিয়মানুযায়ী, প্রতিটি সম্পাদকীয় পদের সঙ্গে পাঁচজন সহ-সম্পাদক নিয়ে সে বিষয়ে একটি উপ-কমিটি করার বিধান করা হয়। যাতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের সদস্য হিসেবে রেখে ওই বিষয়ে কাজ করার কথা ছিল।

দলটির ২০০৯, ২০১২ ও ২০১৬ এর সম্মেলনে গঠনতন্ত্র প্রণয়ণের সঙ্গে জড়িত আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. নূহ-উল-আলম জানান, ২০০৯ এর সম্মেলনে এই ধারা যুক্ত করা হয়।

দলটির দায়িত্বশীল নেতারা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, গঠনতন্ত্রে এই ধারা সংযুক্ত করা হয় এ উদ্দেশ্যে যে, দলের বিভিন্ন দুঃসময়ে যারা নির্যাতিত হয়েছেন, অবদান রেখেছেন, রাজপথে ছিলেন কিংবা সহযোগী ও সমমনা সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ পাননি বা কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যা স্বল্পতায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি, তাদের কেন্দ্রের টাচে রেখে পরবর্তী সময়ের জন্য তৈরি করা।

প্রথমবার অনেকে এই পদ পেলেও পরের বার ২০১২ এর সম্মেলনে উপ-কমিটির সহ-সম্পাদকের পদ নির্দ্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। তখন প্রতিটি বিষয়ভিত্তিক সম্পাদকীয় পদের বিপরিতে সর্বোচ্চ পাঁচ জন বিবেচনায় ৯৫জন সহ-সম্পাদক রাখার বিধান করা হয়। ২০১২ সালে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের পর এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ৬৩ জন সহ-সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেন। কিন্তু এরপর থেকে এখন পর্যন্ত সহ-সম্পাদক পদ বা উপ-কমিটি নিয়ে বিতর্ক চলছেই। কখনও এটা গঠন নিয়ে, কখনও এর পদধারীদের নিয়ে। কেননা ২০১২ সালে সৈয়দ আশরাফ ৬৩ জনের নাম ঘোষণা করার বেশ কিছু দিন পর তৎকালীন এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের ব্যবসায়ীক কার্যালয় থেকে এ পদে প্রায় ৭০ জনের নাম ঘোষণা করা হয়। যদিও তাদের দেওয়া চিঠিতে দলের সভাপতির স্বাক্ষর ছিল। তবে দলীয় কার্যালয় থেকে এ প্রক্রিয়া না হওয়ায় এ নিয়ে সমালোচনা হয়।

এরপর, ২০১৬ সালে সহ-সম্পাদক পদ নিয়ে সমালোচনা পরিপূর্ণতা লাভ করে। সেবার সম্মেলনের পর দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত দফতর সম্পাদকের স্বাক্ষরে কাগজে-কলমে ৪১৬ জনকে সহ-সম্পাদক পদ দেওয়া হয়। যদিও তখন বলা হয়েছিল, এর সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। এতে অসংখ্য বিতর্কিত ব্যক্তি প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের কেন্দ্রের সংশ্লিষ্টতা পায়। এরপর ২০১৯ এর সম্মেলনে এতো সংখ্যক সহ-সম্পাদক না হলেও বিতর্কিতদের এ পদ দেওয়ার ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকে।

আগামীতে এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারি করা হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তিনি বলেন, ‘দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আগে একবার এসব বিষয়ে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমি সবাইকে বার বার অনুপ্রবেশকারীদের প্রবেশ নিয়ে সতর্ক করছি।’

ভোরের সিলেট/বাংলা ট্রিবিউন/টিএ