আজ শনিবার, জুলাই ১১, ২০২০ইং

করোনায় কোরবানির পশু নিয়ে দুশ্চিন্তায় খামারিরা

ভোরের সিলেট ডেস্ক
দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। ইতোমধ্যে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন পশুর হাট ইজারার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বলেছে, স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনেই রাজধানীসহ সারাদেশে কোরবানির পশুর হাট বসবে; কিন্তু যারা কোরবানি পশু কিনবেন সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণি কি কোরবানি দিতে পারবেন? না পারলে এর প্রভাব পড়বে পশুর খামারি-ব্যাপারীদের ওপর। তাদের দুচিন্তায় এবার পশুর দাম পাবে তো?

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সারাদেশে কোরবানিযোগ্য পশুর তথ্য পাওয়া গেছে। সারাদেশের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর কোরবানিযোগ্য পশু আছে ১ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে গরু-মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য পশুর সংখ্যা আলাদা করেনি অধিদপ্তর। আগামী সপ্তাহ পুরো তথ্য মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (খামার) ড. এ বি এম খালেদুজ্জামান বলেন, গত বছর কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা ছিল এক কোটি ১৮ লাখ এবার ১ কোটি ২০ লাখ। তিনি বলেন, দেশের পর্যাপ্ত পশু আছে। তবে করোনার কারণে কোরবানির সংখ্যা একটু কমে যেতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবদুল জব্বার শিকদার বলেন, গত দুই-তিন বছর থেকে আমাদের কোরবানির পশু অন্য দেশ থেকে আনতে হচ্ছে না। গত বছরও ১০ লাখের মতো

পশু অবিক্রীত ছিল। এর মানে আমরা গবাদি পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পেরেছি। এবারও পশু চাহিদার চেয়ে বেশিই আছে। তিনি বলেন, পশু কিভাবে বিক্রি হবে সেটা ঠিক করার দায়িত্ব সংস্থার। যেমন ঢাকায় ঠিক করবে সিটি করপোরেশন। আমরা সিটি করপোরেশনের ঠিক করা হাটে গবাদি পশুর স্বাস্থ্যজনিত চিকিৎসা নিশ্চিত করে থাকি। এবার এর হার বাড়ানো হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে গরু বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ পশু কোরবানি ও জীবন রক্ষা দুটিই জরুরি। আশা করি সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়টি মাথায় নিয়েই কাজ করবেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনার কারণে সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব চলছে। বিপাকে পড়ছেন দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। যারা কয়েকজন মিলে (শেয়ার) কোরবানি দেন। করোনার কারণে এ শ্রেণির সবচেয়ে বিপাকে থাকায় অনেকেই চলতি বছর কোরবানি দিতে পারবেন না। এতে কোরবানির পশু বিক্রি কমে যেতে পারে। এতে পর্যাপ্ত গরু থাকার পরও দাম পাবেন না খামারিরা। এমন উদ্বেগের মধ্যে কোরবানিযোগ্য পশু নিয়ে দুচিন্তায় পড়েছে দেশের গরু খামারি, প্রান্তিকপর্যায়ের কৃষক। যদিও ভারতের গরুর আনা হবে বলে সাফ জানিয়েছে দিয়েছে সরকার।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশ মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পর থেকে ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশ উলেস্নখযোগ্য হারে কমে গেছে। আগে প্রতি বছর ২৪-২৫ লাখ ভারতীয় গরু আসত। ২০১৯ সালে মাত্র ৮৫ হাজার গরু ঢুকেছে। গত বছর সারাদেশে কোরবানিযোগ্য ৪৫ লাখ ৮২ হাজার গরু-মহিষ, ৭২ লাখ ছাগল-ভেড়া এবং ৬ হাজার ৫৬৩টি অন্যান্য পশুর কোরবানিও হয়েছে। আসন্ন ঈদুল আজহায় এক কোটি বেশি পশুর কোরবানি হতে পারে।

এদিকে ঈদুল আজহার পশুর সংখ্যা নিরূপণ, কোরবানির হাটবাজারে স্বাস্থ্যসম্মত পশুর ক্রয়-বিক্রয় ও স্বাস্থ্যসেবা, করোনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে পশুর হাট বসানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিয়ে আগামী সপ্তাহ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আন্তঃ মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে পশুর সম্ভাব্য একটি দাম নির্ধারণ করা হতে পারে।

এ ব্যাপারে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব রওনক মাহমুদ বলেন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে পূর্ণাঙ্গ পশুর তালিকা পাওয়ার পর আন্তঃ মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হবে। সেখানে বিস্তারিত আলোচনা হবে। তার মতে, ঈদের আগে করোনা পরিস্থিতি উন্নতি না হলে কোরবানির পশুর ওপর একটা প্রভাব তো পড়বেই। তারপরও ভারত থেকে কোনো পশু আসবে না এটা খামারিতে জন্য সুখবর।

দুচিন্তায় খামারিরা
কোরবানির ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে, দেশের পশু খামারিদের দুশ্চিন্তা ততই বাড়ছে। কারণ মহামারি করোনায় প্রকোপ এখনো কমেনি, বাংলাদেশে বরং আরও দিন দিন বাড়ছে। এ অবস্থায় খামারিরা পশু বাজারে নিতে পারবেন কিনা, বাজারে নিলেও ক্রেতা মিলবে কিনা, ক্রেতা মিললেও দাম সঠিক পাবেন কিনা এসব বিষয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই আতঙ্কে রয়েছেন দেশের পশু খামারিরা।

কিশোরগঞ্জের শেরপুর জেলার খামারি মনজিল মিয়া। তিনি বলেন, খামারে সারাবছর গরু মোটাতাজাকরণ করে কোরবানির ঈদের অপেক্ষায় থাকি। এবার ১৪টি বড়. মাঝারি সাইজের গরু বিক্রি করব; কিন্তু করোনার কারণে এ গরুগুলো ভালো দাম পাবো কিনা এখনো জানি না। দাম কমে গেলে আমার প্রচুর ক্ষতি হবে।

পাবনার খামারি শোয়েব বলেন, এত টাকা বিনিয়োগ করে যদি কোরবানির ঈদে গরুর দাম ভালো না পাই তাহলে আমাদের খামারিদের দুঃখের সীমা থাকবে না। গরু পালন করতে গিয়ে অনেকে লোন হয়েছে। ধারদেনা করে কোরবানির আশায় গরু পালন করেছি। করোনার বর্তমান অবস্থায় এখন আতঙ্কের মধ্যে আছি। সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার খামারি আল মামুন বলেন, এবার সারা বছর ৫৮টি গরু লালন-পালন করেছি কোরবানির আশায়। এখন করোনা নিয়ে খুব আতঙ্কের মধ্যে আছি।

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার গরু খামারি বেলায়েত হোসেন বলেন, করোনার কারণে দুধে এক দফা মার খেয়েছি। এখন পর্যন্ত দুধে লাভ নেই। কারণ দুধের দামের চেয়ে ভুসির দাম বেশি। এ অবস্থায় কোনো খামারি ভালো নেই। মিল্ক ভিটাও পুরো দুধ নিচ্ছে না। তারা অর্ধেক দুধ নিচ্ছে। বাকি অর্ধেক দুধ আমাদের ফেরি করে বিক্রি করতে হয়।

অনলাইনে জমজমাট হবে পশু বেচাকেনা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা পরিস্থিতিতে অন্যান্য বছরের মতো এবারও পশুর হাট বসলে তা হবে আত্মঘাতী। করোনা সংক্রমণের মধ্যে, হাট বসলে যেখানে স্বাস্থ্যবিধি মানা মোটেই সম্ভব নয়। বরং উল্টো ঝুঁকির সম্ভাবনাই বেশি। করোনা মহামারির এই সময়ে খোলা আকাশের নিচে এই হাটগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করা কতটুকু সম্ভব?

এমন বাস্তবতায় কোরবানির ঈদ সামনে রেখে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অনলাইনে গ্রাহকদের জন্য কোরবানির পশু কেনাবেচার সুযোগ করে দিচ্ছে। এর মধ্যে কোনো কোম্পানি সরাসরি কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে শুধু গরু কেনাবেচার বিজ্ঞাপন দিয়েছে। যেখানে শুধু বিক্রেতা ও ক্রেতা থাকবেন। আবার গোয়াল থেকেই কাঙ্ক্ষিত মূল্যে পালিত পশু বিক্রি করতে পারছেন চাষি বা খামারিরা।

বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত ই-কমার্স সাইটের মাধ্যমে এ সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে অনলাইনে বুকিং দিয়ে কিছু অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করলে নির্দিষ্ট সময়ে বাড়িতে গরু পৌঁছে দেবে বিক্রেতা বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। কোরবানির পশু বিক্রির এসব ওয়েবসাইটে গেলে দেখা যাবে বিক্রির গরুর ছবি, কোড নম্বর, দাম এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভিডিও। গরুর দাম ৩৫ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে। দাম ও সাইজ দেখে কেউ যদি কোনো পশু পছন্দ করেন তবে দিয়ে দিতে পারেন অনলাইনে বুকিং। এর পাশাপাশি ব্র্যাক ব্যাংক ও ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ই-ক্যাশ, বি-ক্যাশ কিংবা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে পছন্দের পশু কিনতে পারবেন ক্রেতারা। ইচ্ছে করলে দেশের বাইরে থেকেও কেউ অর্ডার দিয়ে করতে পারবেন এই কেনাকাটা।

ভোরের সিলেট/যায়যায়দিন/টিএ

সংবাদটি শেয়ার করুন: