আজ শুক্রবার, মে ১৪, ২০২১ইং

ইস যদি পিছনে যাওয়া যেত! আবু জাফর শিহাব

প্রাথমিকের স্মৃতি হালকার উপর মৃদু ঝাপসা হলেও হাইস্কুলে সবাই প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল, দূরন্ত থাকে। ভাল রেজাল্টের প্রতি নজর থাকে কম বেশি সবার। তারপর S.S.C-র গন্ডি পেরোনো বয়েজ এবং গার্লস স্কুল থেকে আসা অধিকাংশ ছেলে মেয়েদের পদচারনায় মুখরিত হয় কলেজ ক্যাম্পাস। নতুন জগৎ, ভিন্ন পরিবেশ তাই বিপরীত লিঙ্গের প্রতি থাকে আলাদা আকর্ষণ। এই সময়ে কেউ জীবনকে গুছিয়ে পরবর্তী স্টপেজ পা রাখে আবার কেউ রোমিও জুলিয়েট বনতে গিয়ে অংকুরেই হারিয়ে যায়। H.S.C-র পাঠ চুকিয়ে ভাল College, University তে অনার্সে কিংবা মেডিকেল, ইন্জিনিয়ারিং এ চান্স পাবার পর থেকে ক্লাস শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত ছেলেরা নিজেকে মনে করে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর আর মেয়েরা নিজেকে ভাবে ঐশ্বরিয়া রায়।

মেয়েরা প্রথম দুই-তিন মাস উচ্চাভিলাষী সাজগোজ আর পোজ দিয়ে ছবি তুলে আর ফেসবুক ইন্সটাগ্রামে আপলোড করে বেড়ায়। ত্রিশ টাকার ফুচকা খেতে গিয়ে ত্রিশটা সেলফি তুলে সবগুলো একই ক্যাপশনে আপলোড দেয়। তাদের স্ট্যাটাস, ছবিতে লাইক কমেন্টও পূর্বের তুলনায় সূচকীয় হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

ওই সময়ে ব্যাচমেট কেউ ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালে তাকে রাখবে নিতান্তই বাচ্চা ছেলের কোটায়। ফোর্থ-ফিফথ ইয়ার হলে নাহয় একটা বিষয় ছিলো!

ক্লাস যখন শুরু হয় তখন আর ভর্তি কোচিং বা চান্স পরবর্তী ঘোরাঘুরির সময়কার মতো সাজুগুজু করে ক্লাসে যাবার সময় থাকে কারো। ঘুম থেকে উঠে সকালের লেকচার ধরতেই জান যায় যায়, সেখানে আবার সাজুগুজু!

দু-তিন বছর যখন যায় যায় তখন তাদের মনে হয় ব্যাচমেটরা বড় হয়ে গেছে। অনেকের মুখে দাড়ি গজিয়েছে।
ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়। সেই শিশুরা ততোদিনে কারো কারো বাবুতে পরিণত হয়। ক্যাম্পাসে নতুন ব্যাচ আসে। নতুন ব্যাচ আসার সাথে ছেলেদের খুশি হওয়ার কী সম্পর্ক বা মেয়েদের জেলাস হবার কী আছে তা জানি না। শুধু জানি লালন ফকির তার গানে গানে বলে গেছেন- ”সময় গেলে সাধন হবে না”।

অন্যদিকে ছেলেদের ভাব-বচনে এ দুই-তিন মাস শুধু জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য ঝরে। বাসে উঠলে ভাবে এই বাসে একজন হবু প্রফেসার, ব্যাংকার, ইন্জিনিয়ার, ডাক্তার বসে আছে। জাতীর অমূল্য রত্ন। এই ফিটনেসবিহীন বাস কেন যে দেশে চলে? আজ যদি এই বাসের কিছু হয় তো গোটা জাতিরই কিছু একটা হয়ে যাবে। আর এই ড্রাইভার আর কন্ট্রাক্টরের কী অসহায় জীবন! সারাদিন মানুষের গালি হজম করা লাগে। তাদের বংশমর্যাদায় দৈনিক এতই গালি পড়ে যে, বাজারের মোড়ের মাজারের দান বাকশোতেও দৈনিক এত টাকা জমা হয় কিনা সন্দেহ?

সি এন জি ঠিক করতে গেলে সি এন জি ড্রাইভার যদি বলে- ‘মামা আপনাকে দিয়েই দিন শুরু করতাছি, সার্জন (সার্জেন্ট) ধরলে কইয়েন মিটারে যাইতাছি’।

হালকা গলা ঝেড়ে বলার ইচ্ছা পোষণ করে – ‘আরে মামা, আপনার সৌভাগ্য যে, একজন হবু ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার নয়তো অনাগত দিনের ঊজ্জ্বল নক্ষত্রকে দিয়ে খ্যাপ শুরু করলেন, টান দেন, সমস্যা হবে না, বিষয়টা আমি দেখবোনে’।

কালের বিবর্তনে ক্লাস শুরুর কিছুদিন পর স্যার যখন বলেন- এতদিন মজা মাস্তি যা করছো ভুলে যাও, সামনের সপ্তাহে পরীক্ষা। তখন মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। কোচিংয়ের ভাই বলেছিলো- এখন মজা মাস্তি সব বাদ দাও, সব মজা মাস্তি চান্স পাওয়ার পর করো।

বাবা মা বলেছিলেন- চান্সটা পেলে যা ইচ্ছা করতে পারবি, এখন শুধু বাধ্য ছেলের মতো আমাদের কথা মেনে চল।
কোচিংয়ের স্টাইলিশ ভাইয়াটা বলেছিলো চান্সটা পেলেই অনেকগুলো প্রেমের অফার আসবে। এখন পড়াশোনায় মন দাও। আর এদিকে চান্স পাওয়ার পর ক্যাম্পাসে কারো চোখে সে মুরগী, কারো চোখে দুগ্ধপোষ্য শিশু। স্যারের ভাষায় মজা মাস্তির দিন পার করে এসেছো। এখন পড়াশোনার সময়।

তখন সে ভাবে – ওই ফিটনেসবিহীন বাসের ড্রাইভার আর কন্ট্রাক্টর কতোইনা সুখী মানুষ! ওই সি এন জি ওয়ালা মামা কত সুন্দর করে মনের আনন্দে বলে – মামা আপনাকে দিয়াই শুরু করতাছি। এটলিস্ট তাদের রাতের ঘুমটা অন্তত আরামে হয়।

শিক্ষা জীবনের যবনিকা টেনে কর্মজীবনে পা রেখেই বিনা অজুহাতে, অকারণে, বিনা দোষে কত কটুকথা, গালি গালাজ, মানসিক টর্চার যে সইতে হয় তার কোন ইয়াত্তাই নেই। সাংসারিক জীবনের ঘানী টানতে হয় কলুরবলদের মত। যদি মুখ বুজে সয়ে যাও তাহলেই তুমি বেশ, অন্যতায় তুমি শেষ! তখন হয় মনে আহারে ওই ড্রাইভার, কন্টাক্টর আর সি এন জি ওয়ালারা কতোই না সুখে আছে। এটলিস্ট তাদের দোষেই মানুষ তাদের গালি দেয়। বিনা দোষে গালি খাওয়ার মানসিক কষ্টে তাদের ভুগতে হয়না। ইস্! তখন হয়ত মনে মনে ভাবে সত্যিই যদি বিশ বছর পেছনে যাওয়া যেতো তাহলে হয়তো সকল অপ্রাপ্তি, ভুল- ভ্রান্তি শোধরে নিতাম। জেনশুনে কখনোই বিষ করতাম না পান।

চাইলেই তো আর সম্ভব নয় সেই সাদা কালোর ক্যানন ক্যামেরার জীবনে প্রত্যাবর্তন করা। তারপরেও কিঞ্চিত চেষ্ঠা করে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটালাম।

লেখক: আবু জাফর শিহাব (এল এল বি)