আজ মঙ্গলবার, মার্চ ৯, ২০২১ইং

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, অপসংস্কৃতি ও সামাজিক অবক্ষয় : আবু জাফর শিহাব

আজ তথাকথিত বিশ্ব ভালবাসা দিবস। আসলে ভালবাসা মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু মানুষ নয় বরং সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব হিসেবে সকল জীবের প্রতি দয়া বা ভালবাসা প্রদর্শন মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যে মধ্যেই পরে। তাই ভালবাসার পরিসরটা বেশ বিস্তৃত। তাই কোন ভাবেই সংকীর্ণ বৃত্তের মধ্যে এটিকে আবদ্ধ করা কথিত ভালবাসার নামে তামাশা ছাড়া কিছু নয়।

বছরের কোন নির্দিষ্ট দিনে ভালবাসার রিহার্সেল দিতে হবে এটাও এক ধরনের আত্মপ্রতারণা। তাই কথিত ভালবাসার নামে আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে অবশ্যই আমাদেরকে বেড়িয়ে আসতে হবে এবং মানুষে মানুষে ভালবাসার বিস্তৃতি ঘটিয়ে আর্ত-মানবতার কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করতে হবে। আর এ দায়িত্ব আমরা কোন ভাবেই এড়াতে পারি না।

বাঙালির একটি নিজস্ব ঐতিহ্য ও হাজার বছরের ইউনিক সংস্কৃতি রয়েছে। মুসলিম অধ্যুষিত এই বাংলাদেশে ইসলামী আবেগ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ বিরাজমান শত শত বছরজুড়ে। কিন্তু বর্তমান সময়ে আধুনিকতার নামে সেই ইউনিক সংস্কৃতির ভেতরে সজ্ঞানে বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রভাব আমরা খুব বেশি পরিমাণে লক্ষ্য করছি। তার একটি সংস্করণ হলো “বিশ্ব ভালোবাসা দিবস” বা ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ যা প্রতিবছর ১৪ই ফেব্রুয়ারীতে পালিত হয় বিশ্বব্যাপী।

বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের উদ্ভব- বেশ কয়েকটি গল্প পাওয়া যায় এই বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এর। তার মধ্যে একটি হলো- রোমের সস্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস-এর আমলের ধর্মযাজক সেন্ট ভ্যালেনটাইন ছিলেন শিশুপ্রেমিক, সামাজিক ও সদালাপী এবং খৃষ্টধর্ম প্রচারক। আর রোম সস্রাট ছিলেন বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজায় বিশ্বাসী। ঐ সস্রাটের পক্ষ থেকে তাকে দেব-দেবীর পূজা করতে বলা হলে ভ্যালেন্টাইন তা অস্বীকার করায় তাকে কারারূদ্ধ করা হয় সস্রাটের বারবার খৃষ্টধর্ম ত্যাগের আজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করলে ২৭০ খৃষ্টাব্দের ১৪ই ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রীয় আদেশ লঙ্ঘনের দায়ে ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়। ভেলেন্টাইন ফাঁসিকাষ্ঠে যাওয়ার আগে তার ভালোবাসার মানুষ জুলিয়াকে একটি চিঠি লেখেন যার শেষে লেখা ছিল ‘তোমার ভেলেন্টাইনের পক্ষ থেকে’। এর পরই ৪৯৬ সালে খ্রিস্টানদের সেই লিওপারসালিয়া বা ফেব্রুয়ালিয়া পুজার নাম ও পদ্ধতি পরিবর্তন করে নিজ ধর্মের যাজক ভেলেন্টাইনের নামে অনুষ্ঠানের নামকরণ করেন। শুরু হয় ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ বা ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’ এর পথচলা।আর আমাদের দেশে এই দিনটি পালন করা শুরু হয় ১৯৯৩ সাল থেকে। তা আজ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।

আমাদের দেশে ভ্যালেন্টাইন দিবসকে সামনে রেখে চারিদিকে যেন উজ্জল লাল ও গোলাপি রং সমারোহ।ফুলের দোকানে লাল গোলাপের দাম তাই চড়া, উপহারের বিভিন্ন দোকানে সুন্দর সুন্দর টেডি বিয়ারগুলির গায়ে গোলাপি কিংবা লাল রংয়ের সুদৃশ্য হার্টের প্রতিকৃতি দিয়ে সাজানো। অলংকার ও ঘড়ি গুলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে ভালোবাসা নিয়ে কোন লিখনী বা মনরঞ্জক কোন উক্তি দিয়ে। এমনকি মিষ্টির দোকানেও দেখা যাচ্ছে হার্টের আকৃতি সম্বলিত কেক বা চকোলেট এর ব্যাবস্থা করতে, তাতে আবার অনুরোধ বা অর্ডারের ভিত্তিতে চকমকে গোলাপি কাভারে সাজানোর ব্যাবস্থাও আছে।

বিশ্ব ভালবাসা দিবসকে চেনার জন্য আরও কিছু বাস্তব নমুনা পেশ করা দরকার। দিনটি যখন আসে তখন শিক্ষাঙ্গনের শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তো একেবারে বেসামাল হয়ে উঠে। নিজেদের রূপা-সৌন্দর্য উজাড় করে প্রদর্শনের জন্য রাস্তায় নেমে আসে। শুধুই কি তাই! অঙ্কন পটীয়সীরা উল্কি আঁকার জন্য পসরা সাজিয়ে বসে থাকে রাস্তার ধারে। তাদের সামনে তরুণীরা পিঠ, বাহু আর হস্তদ্বয় মেলে ধরে পছন্দের উল্কিটি এঁকে দেয়ার জন্য। তারপর রাত পর্যন্ত নীরবে-নিভৃতে প্রেমিক বা প্রেমিকার সাথে খোশ গল্প , চুটিয়ে আড্ডা, অসামাজিকতা, অনৈতিকতা, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নগ্নতা, সবশেষে কখনো কখনো অবৈধ যৌন মিলন ও ধর্ষণ। এ হলো বিশ্ব ভালবাসা দিবসের প্রচ্ছন্ন চিত্র! এ হলো বিশ্ব ভালবাসা দিবসের কর্মসূচি! বিশ্ব ভালবাসা দিবস না বলে বিশ্ব বেহায়াপনা দিবস বললে অন্তত নামকরণটি যথার্থ হতো।

আমি মনে করি ভালবাসার জন্য কোনো বিশেষ দিবসের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু বেলেল্লাপনা, বেহায়াপনা করার জন্য বিশষ সময়, দিবস লাগে, বিশেষ পাত্র বা পাত্রীর দরকার পড়ে। তাই ভালোবাসার কোন দিবস পালন করা একটি ভাওতাবাজি ছাড়া কিছুই নয়। হ্যাঁ, বেহায়াপনার জন্য দিবস হতে পারে। কারণ অশ্লীলতা চর্চাকারীরা তাদের নির্লজ্জ আচরণ সবসময় করতে পারে না, সবার সাথে করতে পারে না। এর জন্য উপলক্ষ দরকার। যে দিবসের আড়ালে বেলেল্লাপনা চর্চার সুযোগ সৃষ্টি হবে। ধর্মের সাথে সংস্কৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বলতে গেলে সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে ধর্মের অনুমোদন প্রয়োজন, তথা সংস্কৃতি ধর্মীয় রীতিনীতির বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে কিনা সেদিকে লক্ষ্য রাখা।

আমার জানা মতে কোনো ধর্মই অশ্লীলতার প্রশ্রয় দেয় না। ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’। কিন্তু এই দিনটি ঘিরে যে অপসংস্কৃতি ও অশ্লীল কর্মকাণ্ডের চিত্র আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে এবং কখনো কখনো সামনাসামনি চোখে পড়ে যায়, তাতে করে অবাক হয়ে যাই। শুধু ভাবি, মানুষ এতো নিলর্জ্জতার ধারক-বাহক হয় কীভাবে! আমি যদি নিজকেই নিজে ভালোবাসি, তাহলে সর্বপ্রকার পাপ থেকে তথা অশ্লীল কাজ থেকে মুক্ত থেকে নিজেকে পরকালের স্থায়ী মহাবিপদ থেকে রক্ষা করতে হবে। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, সারা পৃথিবীর অসংখ্য মুসলমান নামধারী কিছু পাবলিক বিধর্মীদের এই অশ্লীল হুজুগেও গা ভাসিয়ে দিবে। অনেকে হারাবে তার সতীত্ব, পরিশেষে সবাই হারাবে ঈমান।

এই ভ্যালেন্টাইন ডে কি মুসলমানদের কোন ঐতিহ্য? এই ভ্যালেন্টাইন ডে বা তথাকথিত ভালোবাসা দিবস আদৌ কোন ইসলামিক বিষয় নয়। কিন্তু হুজুগে মাতা বাঙ্গালী হুজুগে মেতে নিজেদের ঈমান আমল উভয়ই অকাতরে বিসর্জন দিচ্ছে।

অতএব ভালোবাসা কোনো পঙ্কিল শব্দ নয়, নয় কোনো নর্দমা থেকে উঠে আসা বা বস্তাপঁচা বর্ণগুচ্ছ। ভালোবাসা এক পুণ্যময় ইবাদতের নাম। ভালোবাসতে হবে প্রত্যেক সৃষ্টজীবকে, প্রতিটি মুহূর্তে। এর জন্য কোনো দিন নির্ধারণ করা, বিশেষ উপায় উদ্ভাবন করা মানব জাতির চিরশত্রু ইবলিসের দোসর ছাড়া অন্য কারও কাজ হতে পারে না।

আসুন- আগে আমরা অভিভাকরা সচেতন হই, সচেতন করি আমাদের সন্তানদের। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস পালনের নামে আমাদের সন্তানকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে বাঁচাই, সতর্ক হই আমাদের পরিবার ও সমাজকে অশ্লীলতা থেকে বাঁচাতে। বিশ্ব ভালবাসা দিবসের নামে এসব ঈমান বিধ্বংসী কর্মকান্ড হতে আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে হেফাযত করুন।

লেখক: আবু জাফর শিহাব (এল এল বি)

আজকের সংবাদ