আজ বৃহস্পতিবার, মে ১৩, ২০২১ইং

স্মার্টফোনে শিশুদের ক্ষতি হচ্ছে! হে মা-বাবা, আপনি এই ক্ষতিতে জড়িত নন তো?

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যতের উজ্জ্বল নক্ষত্রদের হাতে, নিজেদের অজান্তেই আমরা তুলে দিচ্ছি, তাদের ধ্বংসের হাতিয়ার স্মার্টফোন। বর্তমানে শিশুদের সিংহভাগ সময় দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন তথা প্রযুক্তি। এখন শিশুরা সাধারণত মোবাইল টেলিভিশন, স্মার্টফোন, ট্যাব, ইউটিউবে সময় কাটান। এটা অনেকেই ভালোভাবে দেখেন। কিন্তু এই প্রযুক্তির কারণে শিশুদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সেদিকে খেয়াল রাখছেন না অনেকেই।

প্রায়ই দেখা যায়, অভিভাবকরা বাচ্চাকে শান্ত রাখার জন্য তার হাতে স্মার্টফোন বা ট্যাব ধরিয়ে দেন। গান, কার্টুন বা মজার ভিডিও চালিয়ে দিয়ে তাকে শান্ত রাখা হয়। আপনার-আমার সবার বাসাতেই এই চিত্র এখন নিত্যদিনের। স্মার্টফোনের কল্যাণে শিশুদের শান্ত রাখা, খাওয়ানো, এমনকি বর্ণমালা ও ছড়া শেখানোর কাজটিও বাবা-মায়ের জন্য অনেক সহজ ও স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠেছে। বিপরীতে স্মার্টফোনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে শিশুদের। আর এই নির্ভরশীলতাই আমাদের অজান্তে শিশুদের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে। বড়দের উদাসীনতা বা নেকামির কারণে ছোট বাচ্চারা মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে; যার প্রভাব ও কুফল খুবই ভয়ঙ্কর। শিশুরা ফোন চাইলেই দিতে হবে এটা নিশ্চয়ই স্মার্টনেস নয়।

বাচ্চারা ইচ্ছামতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেইম খেলছে, ভিডিও দেখছে, ফোন নিয়ে যাচ্ছেতাই করছে। যা হোক অতি স্মার্ট বানাতে গিয়ে আদরের সোনামণিদের জীবন ও ভবিষ্যৎ ধ্বংসের দিকে ধাবিত করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

স্মার্টফোনের অতি আসক্তির কুফল:
স্ক্রিনের রেডিয়েশন প্রাপ্তবয়স্কদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, শিশুদের জন্য তা আরও বেশি মারাত্মক ক্ষতিকর, যা কিনা তাদের মস্তিষ্কের বিকাশকে ব্যাহত করে। মোবাইল ফোন ব্যবহার শিশুদের শ্রবণক্ষমতাও হ্রাস করে দেয়। মোবাইলের প্রতি আসক্তি শিশুদের সামাজিক দক্ষতা নষ্ট করছে। ফলে তৈরি হয় শিশুদের নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা। তাছাড়া প্রযুক্তির এ আসক্তির ফলে শিশুদের আবার দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হচ্ছে; ফলে শিশুর স্থূলতাও বেড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখার ফলে শিশুর চোখের সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। শিশুদের পারিবারিক ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।

প্রযুক্তি এমন সময়ে হালের শিশুরা যে কোনো প্রাপ্তবয়স্কের চেয়ে অনেক বেশি পারদর্শী। তার কিছুটা ‘কৃতিত্ব’ রয়েছে কিন্তু বড়দেরই। শিশুর বায়না সামলাতে বা তাকে এক জায়গায় বসিয়ে রাখতে আপনিও কি হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন নিজের স্মার্টফোন? আর তা ঘাঁটতে ঘাঁটতেই শিশু শিখে ফেলছে মোবাইলের খুঁটিনাটি?
‘আমার ছেলেমেয়েরা স্মার্টফোনের সব জানে’— বলে গর্ব করলেও জানেন কি আপনার এই স্বভাবই মারাত্মক ক্ষতি করছে শিশুর?

  • স্মার্টফোন আসক্তির অন্যান্য কুফলগুলো হলো:
    * স্মার্টফোনের বা ইন্টারনেটের প্রতি অতি আসক্তি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধাগ্রস্থ করে ।
    * শিশুর সহজাত সামাজিক গুণাবলীর বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়, ধৈর্য্য ও মনোযোগ কমে যায় এবং সে ধীরে ধীরে অসহিষ্ণু,       অসামাজিক ও উচ্ছৃংখল হয়ে পড়তে পারে।
    * স্মার্টফোনের মাধ্যমে অপ্রাপ্ত বয়সে না বুঝেই শিশুরা বিভিন্ন অনৈতিক ও আপত্তিকর বিষয়বস্তুর সাথে পরিচিতি লাভ করে। গবেষকদের ধারণা অতিরিক্ত স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশু ও তরুণদের মধ্যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অভাব প্রবল ভাবে বেড়ে যায়।‌
    * অতিরিক্ত সময় ধরে ফোন ব্যবহার করার কারণে স্বাভাবিক ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। ফলে শিশুরা “মনোযোগের ঘাটতিজনিত চঞ্চলতা” নামক জটিলতায় ভোগতে পারে।
    * স্মার্টফোনের পর্দার দিকে বেশী সময় ধরে তাকিয়ে থাকার ফলে শিশুদের চোখে নানা প্রকার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
    * শিশুরা বেশিরভাগ সময়ই বসে বা শুয়ে স্মার্টফোন বা ট্যাব ব্যবহার করে। এসব শিশুরা ঘরের বাইরে শারীরিক কসরতপুর্ণ খেলাধুলার প্রতি তেমন আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। অতিরিক্ত বসে না শুয়ে থাকার ফলে অল্প বয়সেই তাদের দেহের ওজন অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পায়।
    * গবেষণায় দেখা গেছে যে যেসব শিশুরা অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার করে তাদের ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কিত বিভিন্ন জটিলতা যেমন: হার্টঅ্যাটাক, স্ট্রোক ও কিডনি রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি হয় ।

আমি, একটা চোখের ডায়াগনিস্টিক সেন্টারে কাজ করার সুবাধে, প্রায় দেখি শিশুদের নাকের ডগায় ঝুলে থাকে চশমা। মাঝে মাঝে আশ্চর্য হই। এত অল্প বয়স ওদের চোখে চশমা কেন? উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমার এক স্যার (চোখের ডাক্তার) সঙ্গে কথা বললাম। তিনি জানাল বিস্তারিত। উনার বক্তব্য, এখন বাবা-মারা শিশুদের যাচ্ছেতাইভাবে নিজের মোবাইল ব্যবহার করতে দেন অথবা বিনোদনের জন্য কিনে দেন ট্যাব যে তার অবসর কিংবা পড়াশুনা ফাঁকি দিয়ে নানা ধরনের গেম খেলে। সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকে মোবাইল বা ট্যাবের স্ক্রিনের দিকে। ফলে সে দূরের অথবা কাছের বস্তু ঝাপসা দেখে অথবা দেখতে পায় না স্পষ্টভাবে। এই রোগটাকে বলা হয় চোখের ক্ষীণ দৃষ্টি সমস্যা। এই রোগের কারণে ক্লাসের পেছনে বসলে সামনের বোর্ড স্পষ্ট দেখতে পায় না শিশুরা। চিকিৎসক বলেছেন, দিনের বেশিরভাগ সময় স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখার কারণে ক্ষীণ দৃষ্টিতে আক্রান্ত হয় শিশুরা। ফোনে ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখে, গেমস খেলে চোখের পলক না ফেলে বিরামহীনভাবে। ফলে এই দৃষ্টি সমস্যা দেখা দেয়।

বিভিন্ন মেডিসিনের কভারে যেমন লেখা থাকে- শিশুদের নাগালের বাহিরে রাখুন। ঠিক একইভাবে অভিভাবকদের মনে লিখে রাখতে হবে- শিশুদের ফোন থেকে দূরে রাখুন।

শিশুর পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশের জন্য, স্মার্টফোন থেকে দূরে রাখতে সচেতন হতে হবে। শিশুর কান্না থামাতে বা খাবার খাওয়াতে মোবাইল হাতে দেবেন না। প্রথম প্রথম হয়ত সে কান্নাকাটি করবে, কিন্তু একটা সময় পর ঠিক অভ্যাস হয়ে যাবে। আপনার শিশুর পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশের জন্য আপনাকেই সচেতন হতে হবে।

মনে রাখতে হবে স্মার্টফোন থাকলেই স্মার্ট হয় না, প্রযুক্তির অভিশাপ থেকে নিজে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখাই হলো প্রকৃত স্মার্ট।

লেখক: আবু জাফর শিহাব (এল এল বি)